ঢাকা || ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

নির্বাচনের আগে হঠাৎ রেমিট্যান্স বন্যা: প্রবাসী আয়ের আড়ালে কি দেশে ঢুকছে নির্বাচনী তহবিল?

নির্বাচনের আগে হঠাৎ রেমিট্যান্স বন্যা: প্রবাসী আয়ের আড়ালে কি দেশে ঢুকছে নির্বাচনী তহবিল?

ব্যাংক ইনফো

প্রকাশিত: ২১:২০, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে দেশে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—এই বিপুল অর্থপ্রবাহ কতটা প্রকৃত শ্রমঘন রেমিট্যান্স, আর কতটা নির্বাচনী ব্যয়ের অর্থ, যা প্রবাসী আয়ের নামে দেশে ঢুকছে?

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (৩১৭ কোটি ডলার)। রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। অথচ জানুয়ারি মাস সাধারণত প্রবাসী আয়ের মৌসুমি উচ্চ সময় নয়। দেশে প্রবাসী আয় বাড়ে মূলত দুই ঈদের আগে। কিন্তু এবারের জানুয়ারিতে ঈদ নেই—আছে জাতীয় নির্বাচন।

ব্যাংকারদের সরাসরি অভিযোগ: নির্বাচনী খরচের টাকা আসছে রেমিট্যান্স নামে

একাধিক বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নির্বাচনী ব্যয় মেটানোর জন্য বিপুল অর্থ বিদেশ থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আনা হচ্ছে, যা কাগজে-কলমে প্রবাসী আয় হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব দেশে বাংলাদেশি প্রবাসীর সংখ্যা বেশি, সেসব দেশ থেকেই হঠাৎ রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে

অনেক প্রার্থীর জন্য বিদেশে বসেই তহবিল সংগ্রহ করা হচ্ছে। সেই অর্থ ব্যক্তিগত বা আত্মীয়স্বজনের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে দেশে পাঠানো হচ্ছে। নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই প্রবণতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে

ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি মূলত রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি পরিচিত কৌশল, যেখানে নির্বাচনী ব্যয়ের অর্থ সরাসরি আনলে নজরদারিতে পড়ার আশঙ্কা থাকায় রেমিট্যান্সের আবরণ ব্যবহার করা হয়।

ডিসেম্বর–জানুয়ারি: পরপর দুই মাসে রেকর্ড অঙ্ক

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসে প্রবাসী আয় এসেছিল ৩২২ কোটি ডলার—একক মাস হিসেবে যা দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জানুয়ারিতে এসেছে ৩১৭ কোটি ডলার।  দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩২৯ কোটি ডলার এসেছিল গত বছরের মার্চে, তখন ঈদুল ফিতরের প্রস্তুতির কারণে প্রবাসীরা বেশি অর্থ পাঠিয়েছিলেন। 

কিন্তু এবার ঈদ ছাড়াই পরপর দুই মাসে এত বড় অঙ্কের রেমিট্যান্স আসাকে স্বাভাবিক প্রবণতা হিসেবে দেখছেন না অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ।

সংখ্যার ভেতরের অসঙ্গতি

গত বছরের পরিসংখ্যান বলছে, জুলাই: ২৪৮ কোটি ডলার, আগস্ট: ২৪২ কোটি ডলার, সেপ্টেম্বর: ২৬৯ কোটি ডলার, অক্টোবর: ২৫৬ কোটি ডলার, নভেম্বর: ২৮৯ কোটি ডলার। অর্থাৎ হঠাৎ করেই ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে প্রবাহ লাফিয়ে বেড়েছে। এই উল্লম্ফনকে নির্বাচনকালীন বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০২৫ সালে রেমিট্যান্স প্রায় রিজার্ভের সমান!

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে মোট প্রবাসী আয় এসেছে ৩ হাজার ২৮২ কোটি ডলার—যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রায় সমান। এত বিপুল অঙ্কের অর্থ প্রবাহ অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক হলেও এর উৎস ও ব্যবহার নিয়ে স্বচ্ছতা না থাকলে তা ভবিষ্যতে ঝুঁকির কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা।

হুন্ডি কমেছে, নাকি রূপ বদলেছে?

ব্যাংক খাতের একটি অংশ দাবি করছে, অর্থ পাচার কমে যাওয়ায় হুন্ডি ব্যবসা কিছুটা কমেছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকায় বৈধ পথে রেমিট্যান্স বেড়েছে। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন—হুন্ডি কি সত্যিই কমেছে, নাকি শুধু রূপ বদলে এখন ‘বৈধ’ চ্যানেল ব্যবহার করে রাজনৈতিক অর্থ দেশে ঢুকছে? নির্বাচন, রেমিট্যান্স ও নীরব নজরদারি। 

বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ হঠাৎ বেড়ে গেলে তার উৎস, উদ্দেশ্য ও ব্যবহার নিয়ে নির্বাচন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন।

নাহলে প্রবাসী আয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচক রাজনৈতিক অর্থায়নের নিরাপদ করিডরে পরিণত হতে পারে—যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে অর্থনীতি, ব্যাংকিং শৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর।