ঢাকা || ১৬ এপ্রিল ২০২৬

ব্যাংকে উদ্বৃত্ত তারল্য, তবু ঋণ পাচ্ছে না বেসরকারিখাত

ব্যাংকে উদ্বৃত্ত তারল্য, তবু ঋণ পাচ্ছে না বেসরকারিখাত

ব্যাংক ইনফো

প্রকাশিত: ০৮:৫২, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

দেশে ব্যাংক খাতে বর্তমানে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ নগদ অর্থ জমা আছে। ব্যাংকের আমানতের উৎসগুলোও অনেক বেশি স্থিতিশীল। আমানতের প্রবৃদ্ধিও বেড়েছে, অর্থাৎ ব্যাংকের হাতে ঋণ দেওয়ার মতো যথেষ্ট টাকা আসছে। কিন্তু তারপরও বেসরকারি খাতে ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোর আগ্রহ কম।

গতকাল বুধবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘ব্যাংকিং খাতের সমন্বয়: ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক এক ফোকাস গ্রুপ আলোচনায় এ কথা উঠে আসে।

অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। গত সাত মাসে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়া বেড়েছে প্রায় ৬৭৩ শতাংশ। অন্যদিকে বেসরকারি ব্যবসা-বাণিজ্যে ঋণের গতি কমে গেছে।

আর ব্যাংক খাতের প্রতিনিধিরা জানান, বর্তমানে শিল্প খাতের মোট ঋণের অর্ধেকের বেশি অনাদায়ি হয়ে পড়েছে। এসব ঋণের মধ্যে খেলাপির হার ৩১ শতাংশের বেশি। ছোট ও মাঝারি (এসএমই) খাতের ঋণের অন্তত এক–তৃতীয়াংশ নির্দিষ্ট সময়ে ফেরত আসছে না। অন্যদিকে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়া বাড়িয়েছে।

ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। সভায় আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার; বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (গবেষণা) মো. আবদুল ওয়াহাব, পরিচালক নওশাদ মোস্তফা ও সেলিম আল মামুন; এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম শামসুল আরেফিন, সিটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আশানুর রহমান প্রমুখ।

সূচনা বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ জানান, ব্যাংক খাতে তারল্যের সংকট নেই; বরং ৩ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে। এরপরও বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমছে।

তাসকীন আহমেদ বলেন, উদ্যোক্তারা এখন এক ভয়াবহ দুষ্টচক্রে আটকে পড়েছেন। পুরোনো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দিচ্ছে না। আবার পর্যাপ্ত আয় না থাকায় তাঁরা আগের ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না, যা তাঁদের ধীরে ধীরে খেলাপি হওয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

জ্বালানি বড় সমস্যা

অনুষ্ঠানে বিএবি চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার বলেন, ‘জ্বালানিসংকট আমাদের জন্য একটি বড় সমস্যা। যেসব এলাকায় জ্বালানিসংকট বেশি, সেখানকার ব্যাংকে (ঋণ আদায়) সমস্যাও বেশি।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা বলেন, ‘আর্থিক খাতে আমাদের প্রকৃত তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। এতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হয়।’

এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম শামসুল আরেফিন বলেন, বর্তমানে পরিবেশবান্ধব গ্রিন প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়টিকে ব্যাংকগুলো প্রাধান্য দিচ্ছে। উদ্যোক্তারা এ ধরনের ব্যবসায় এগিয়ে এলে সহজে ঋণ পাবেন।

সিটি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক আশানুর রহমান জানান, ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্যের বড় অংশই বিনিয়োগ রয়েছে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে। সেটি বাদ দিলে তারল্য থাকে মাত্র ২৭ হাজার কোটি টাকা। ডলারের দাম মাত্র ১ টাকা বাড়লে আমদানি ব্যয় মেটাতে এই টাকা চলে যাবে। আর সরকার বাজেট সহায়তায় ব্যাংক থেকে দেড় লাখ কোটি টাকা ঋণ নিলে কোনো অতিরিক্ত তারল্য থাকবে না।

‘সরকার মাশুল দিচ্ছে’
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘আমরা (সরকার) কোনোমতেই কোনোভাবে বাংলাদেশ ব্যাংককে ডিক্টেট করতে (প্রভাব খাটাতে) চাই না; বরং রাজস্ব ও মুদ্রানীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করবে সরকার।’

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বর্তমান সরকার যেহেতু বিপুল জনরায় নিয়ে সরকার পরিচালনায় এসেছে, তাই বৈশ্বিক সংকটের অভিঘাতে দেশে মানুষের জীবনযাত্রার কষ্ট যেন লাঘব হয়, সেই বিষয়কে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে সরকার। এ কারণে জ্বালানি তেলের দাম এখনো বাড়ানো হয়নি।