ঢাকা || ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংক গঠনে অধ্যাদেশ জারি

মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংক গঠনে অধ্যাদেশ জারি

ব্যাংক ইনফো

প্রকাশিত: ১২:০২, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬

দীর্ঘদিনের আলোচনার পর দেশে মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পথ খুলে দিয়ে অধ্যাদেশ জারি করেছে সরকার। “মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংক অধ্যাদেশ ২০২৬” শীর্ষক এই আইনের মাধ্যমে মাইক্রোক্রেডিট প্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্মসহ ব্যক্তি উদ্যোক্তারা এসব ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার হতে পারবেন।

অধ্যাদেশ অনুযায়ী, মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংকগুলো সোশ্যাল বিজনেস (সামাজিক ব্যবসা) হিসেবে পরিচালিত হবে। এতে বিনিয়োগকারীদের জন্য লভ্যাংশ সীমিত রাখা হয়েছে—তারা সর্বোচ্চ তাদের বিনিয়োগের সমপরিমাণ অর্থই লভ্যাংশ হিসেবে পাবেন। তবে ঋণগ্রহীতা-শেয়ারহোল্ডাররা লভ্যাংশ পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

আইনে বলা হয়েছে, এসব ব্যাংক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করতে পারবে। পাশাপাশি নিজেদের সম্পদ জামানত রেখে অন্যান্য ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের সুযোগও থাকবে। নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য হ্রাসের লক্ষ্যে এসব ব্যাংক জামানতসহ বা জামানত ছাড়াই ঋণ প্রদান করতে পারবে।

মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংকগুলো তরুণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় সরাসরি মূলধনী বিনিয়োগ করতে পারবে। এছাড়া শিল্প ও কৃষিভিত্তিক পণ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, যন্ত্রপাতি এবং খুচরা যন্ত্রাংশ ক্রয় ও সংরক্ষণে অর্থায়নের সুযোগ থাকবে।

অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক এসব ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান করবে। লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যাংকগুলো একটি জেলা, একাধিক জেলা বা বিভাগ, কিংবা সারা দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। লাইসেন্সের জন্য আবেদন করার আগে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর অধীনে নিবন্ধিত হতে হবে।

প্রতিটি মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন হবে ৫০০ কোটি টাকা, যার মধ্যে ন্যূনতম ২০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে কার্যক্রম শুরু করতে হবে। ব্যাংক পরিচালনায় থাকবে ১০ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ। এর মধ্যে তিনজন থাকবেন ঋণগ্রহীতা-শেয়ারহোল্ডারদের প্রতিনিধি, দুজন বাংলাদেশ ব্যাংকের মনোনীত এবং তিনজন অন্যান্য শেয়ারহোল্ডারদের প্রতিনিধি। ব্যবস্থাপনা পরিচালক বোর্ডের সদস্য হবেন, তবে তার ভোটাধিকার থাকবে না।

আইন মন্ত্রণালয় বুধবার অধ্যাদেশটি জারি করে। উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদনের দুই সপ্তাহ পর গেজেট আকারে এটি প্রকাশিত হয়। তবে শীর্ষস্থানীয় কিছু মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানের আশঙ্কা, নতুন ব্যাংকগুলো মাইক্রোফাইন্যান্স খাতের দারিদ্র্য বিমোচন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ভূমিকা দুর্বল করতে পারে।

ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ অধ্যাদেশটিকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এর মাধ্যমে স্টার্টআপ ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রথমবারের মতো দেশের নিয়ন্ত্রিত আর্থিক কাঠামোর স্বীকৃতি পাচ্ছে। তিনি বলেন, “ইনোভেশন ফাইন্যান্সের জন্য দীর্ঘদিন ধরে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালার প্রয়োজন ছিল।” তবে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় নিয়ন্ত্রকদের সক্ষমতা ও নমনীয়তা নিয়ে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

ক্রেডিট ডেভেলপমেন্ট ফোরামের চেয়ারম্যান মুর্শেদ আলম সরকার বলেন, অধ্যাদেশটি সামাজিক ব্যবসার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। তবে মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংকগুলো বাস্তবে কীভাবে পরিচালিত হবে, তা বিধিমালা প্রণয়নের পর স্পষ্ট হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ইনএম) নির্বাহী পরিচালক মুস্তাফা কে মুজেরী বলেন, এসব ব্যাংক হবে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান, যারা মূলত গ্রামীণ ও উপশহর এলাকায় কাজ করবে। এতে আমানত ও ঋণে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে এবং ব্যাংকিং খাতে পুনর্গঠনের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। তিনি পরীক্ষামূলকভাবে সীমিত সংখ্যক লাইসেন্স দেওয়ার পরামর্শ দেন।

মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, সামাজিক ব্যবসা হিসেবে বিনিয়োগকারীরা কেবল মূলধন সমপরিমাণ লভ্যাংশই পাবেন, যা বাস্তবে আদায় হতে ১০–১৫ বছর সময় লাগতে পারে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং ও মাইক্রোফাইন্যান্স—উভয় খাতই চাপে রয়েছে এবং এই নতুন হাইব্রিড কাঠামোর কার্যকারিতা বাস্তবায়নের পরই স্পষ্ট হবে।