ঢাকা || ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বাংলাদেশ ব্যাংকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ঘিরে কর্মকর্তাদের তীব্র ক্ষোভ

পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই উপদেষ্টার মেয়াদ বাড়ানোর অভিযোগ

বাংলাদেশ ব্যাংকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ঘিরে কর্মকর্তাদের তীব্র ক্ষোভ

ব্যাংক ইনফো

প্রকাশিত: ২২:৩৯, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরিবিধি অনুযায়ী চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বা পুনর্নিয়োগের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। কিন্তু সেই নিয়ম অমান্য করে পর্ষদের অনুমোদনের আগেই গভর্নরের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পাওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. আহসান উল্লাহর চুক্তির মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয়েছে—এমন অভিযোগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নেওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চুক্তিভিত্তিক উপদেষ্টা ও পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব নিয়োগের বড় অংশই অপ্রয়োজনীয় এবং এর ফলে অভিজ্ঞ ও নিয়মিত কর্মকর্তাদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে স্বাভাবিক পদোন্নতি ব্যাহত হওয়ায় কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা ও অসন্তোষ বাড়ছে বলে জানান তারা।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অনেক ক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও নিয়ম বহির্ভূতভাবে তা বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকে যে সংখ্যক উপদেষ্টা ও পরামর্শক চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত রয়েছেন, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এতে একদিকে কর্মপরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক সংস্কার ও শক্তিশালীকরণের লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ৬ জানুয়ারি গভর্নরের উপদেষ্টা হিসেবে এক বছরের জন্য সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. আহসান উল্লাহকে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়মিত অবসরের পর তিনি এই পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং একটি সংস্কার প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। পরদিন ৬ জানুয়ারি গভর্নর একক সিদ্ধান্তে তার মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়ে দেন।

পরবর্তীতে গত ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় বিষয়টি উপস্থাপন করা হলে পর্ষদ সদস্যরা উপদেষ্টার মেয়াদ বাড়ানোর যৌক্তিকতা এবং তার কার্যক্রমের লিখিত বিবরণ জানতে চান। এসব প্রশ্নের কারণে তার মেয়াদ বৃদ্ধির অনুমোদন আটকে যায়। তবে পর্ষদের অনুমোদন না পেলেও সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা এখনো নিয়মিত অফিস করছেন বলে জানান কর্মকর্তারা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মো. আহসান উল্লাহ নির্ধারিত সংস্কার কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি আনতে ব্যর্থ হলেও দৈনন্দিন অপারেশনাল কাজে হস্তক্ষেপ করছেন। এমনকি তিনি নীতিনির্ধারণী বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন এবং নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

কর্মকর্তারা আরও জানান, তিনি বিভিন্ন বিষয়ে কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিচ্ছেন এবং তার নির্দেশনা না মানলে গভর্নরের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দিচ্ছেন। এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে ভয় ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে এবং প্রশাসনিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “নিয়মিত পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হলে যোগ্য কর্মকর্তারা বঞ্চিত হন, এটা স্বাভাবিক। এতে স্বাভাবিক পদোন্নতিও কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয় এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে। পদোন্নতি কর্মস্পৃহা তৈরির সবচেয়ে বড় উপাদান—এ বিষয়টি প্রতিষ্ঠানকে বিবেচনায় নিতে হবে।”

উপদেষ্টা মো. আহসান উল্লাহ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “তিনি নিজেও একসময় বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মিত কর্মকর্তা ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার জায়গা থেকেই হয়তো তিনি বিভিন্ন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে থাকতে পারেন। তবে গভর্নর নিশ্চয়ই বিষয়টি বিবেচনায় নেবেন।”

এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকে চুক্তিভিত্তিক উপদেষ্টা ও পরামর্শক নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল (বিবিওডব্লিউসিডি)। গভর্নরের কাছে পাঠানো এক লিখিত চিঠিতে সংগঠনটি অভিযোগ করে বলেছে, অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় উপদেষ্টা নিয়োগের ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মপরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে অস্থিরতা বাড়ছে।

এ বিষয়ে কাউন্সিলের সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরিবিধি অনুযায়ী পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়া গভর্নর এককভাবে কোনো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বা পুনর্নিয়োগ দিতে পারেন না। কিন্তু এই নিয়ম অমান্য করে উপদেষ্টা আহসান উল্লাহর মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয়েছে। পরে বিষয়টি পর্ষদে তোলা হলেও অনুমোদন মেলেনি। বরং তার কাজের মূল্যায়ন করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছে।”

কাউন্সিলের মতে, কর্মকর্তাদের মধ্যে সৃষ্ট উদ্বেগ ও অসন্তোষ দ্রুত নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করবে ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সামনে বিস্তারিত তুলে ধরে সংগঠনটি।

city-bank
city-bank