ঢাকা || ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট ১৪ গভর্নর বেশির ভাগই ছিলেন আমলা এবারই ব্যবসায়ী

বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট ১৪ গভর্নর বেশির ভাগই ছিলেন আমলা এবারই ব্যবসায়ী

ব্যাংক ইনফো

প্রকাশিত: ২১:৩৪, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

কী যোগ্যতা থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হওয়া যাবে, এ নিয়ে উন্নত দেশগুলোতে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলেও বাংলাদেশে তা নেই। ফলে সরকার চাইলে যে কাউকে গভর্নর নিয়োগ দিতে পারেন। গতকাল বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চতুর্দশ গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ব্যবসায়ী মোস্তাকুর রহমান। তিনি হেরা সোয়েটার্স লিমিটেড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

১৯৬৬ সালে জন্মগ্রহণকারী মোস্তাকুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে বিকম (অনার্স) ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। এরপর ১৯৯২ সালে আইসিএমএবি থেকে পেশাদার ডিগ্রি অর্জন করেন। বিজিএমইএর বাংলাদেশ ব্যাংকবিষয়ক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন মোস্তাকুর রহমান। ১৯৯৮-২০০০ সময়ে তিনি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের পর্ষদ সদস্যও ছিলেন। এ ছাড়া তিনি ঢাকা চেম্বার, রিহ্যাব ও আটাবের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালিত হয় বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ অনুযায়ী। সেখানে বলা আছে, সরকার গভর্নর পদে নিয়োগ দেবে এবং এর মেয়াদ হবে চার বছর। সরকার চাইলে মেয়াদ বাড়াতেও পারবে।

গভর্নর হতে গেলে সাধারণত আর্থিক বাজার ও অর্থনীতি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ধারণা থাকতে হয়। অভিজ্ঞতা থাকতে হয় আন্তর্জাতিক মুদ্রা ও অর্থায়নব্যবস্থা নিয়েও। দেশের মুদ্রা সরবরাহ কত হবে, টাকার মান কতটা বাড়বে, মূল্যস্ফীতির হার কত রাখা হবে—এসবই ঠিক করেন গভর্নর।

দেশের প্রতে৵ক মানুষের জীবনযাপনের মান, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তাঁর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার মূল ব্যক্তি তাই কীভাবে নিয়োগ পাবেন, কী যোগ্যতাই-বা থাকতে হবে তাঁর, তা প্রায় সব দেশই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে।

বেশির ভাগ দেশেই আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংকিংয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিকেই বেছে নেওয়া হয়। কোনো দেশই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদের জন্য রাজনৈতিক পরিচয় বা সমর্থনকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয় না, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকেই বিবেচনা করা হয়।

দীর্ঘ সময় গভর্নরের সর্বোচ্চ ৬৫ বছরের বাধ্যবাধকতা ছিল। একাদশ গভর্নর ফজলে কবিরকে দ্বিতীয় দফায় নিয়োগ দিতে ২০২০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধন করে বয়স বাড়িয়ে ৬৭ বছর করা হয়। প্রথম দফায় চার বছর শেষ করে দ্বিতীয় দফায় ৬৭ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি গভর্নর ছিলেন।

তবে ফজলে কবিরের মেয়াদ তিন সপ্তাহ বাকি থাকতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বাদশ গভর্নর নিয়োগ পান তৎকালীন অর্থসচিব আব্দুর রউফ তালুকদার। ২০২২ সালের ১১ জুন গভর্নর হিসেবে চার বছর মেয়াদে নিয়োগ পেলেও আব্দুর রউফ তালুকদার যোগ দেন ওই বছরের ১২ জুলাই।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে যাচ্ছিলেন না আব্দুর রউফ তালুকদার। পরে ৯ আগস্ট তিনি পদত্যাগ করেন।

এরপর একই বছরের ১৪ আগস্ট ত্রয়োদশ গভর্নর হয়ে আসেন বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। আহসান এইচ মনসুরকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ সংশোধন করতে হয়েছে। সংশোধন করে বয়সের সীমারেখা তুলে দেওয়া হয়। যোগদানের দিন আহসান এইচ মনসুরের বয়স ছিল ৭২ বছর ৮ মাস।

স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ১৪ জন গভর্নর নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তাঁদের বেশির ভাগই আমলা। প্রথম গভর্নর ছিলেন আ ন ম হামিদুল্লাহ। আ ন ম হামিদুল্লাহ (১৯৭২-৭৪) ছিলেন একজন ব্যাংকার। গভর্নর হওয়ার আগে পাকিস্তানের ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশনের (পরে এটি উত্তরা ব্যাংক হয়েছে) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন।

দ্বিতীয় গভর্নর এ কে নাজিরউদ্দীন আহমেদ। তিনি গভর্নর ছিলেন ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত। স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের নির্বাহী পরিচালক, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অব পাকিস্তানের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন তিনি। এ ছাড়া তিনি বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) কাজ করেছেন।

দেশের সবচেয়ে বেশি সময় গভর্নর ছিলেন এম নূরুল ইসলাম। তিনি তৃতীয় গভর্নর। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত টানা ১১ বছর গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তিনিই বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম আমলা গভর্নর। তিনি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের (সিএসপি) কর্মকর্তা ছিলেন।

চতুর্থ গভর্নর আরেক আমলা শেগুফ্তা বখ্ত চৌধুরী (১৯৮৭-৯২)। তিনি কর ক্যাডারের কর্মকর্তা ছিলেন। পঞ্চম গভর্নর হন এম খোরশেদ আলম (১৯৯২-৯৬)। তিনিও ছিলেন একজন সিএসপি কর্মকর্তা। এর পরে ষষ্ঠ গভর্নর হন লুৎফর রহমান সরকার (১৯৯৬-৯৮)। তিনি ছিলেন একজন ব্যাংকার, সোনালী ব্যাংকসহ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন তিনি।

সপ্তম গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন (১৯৯৮-০১)। তিনি অর্থনীতির শিক্ষক ছিলেন, আবার আমলাও ছিলেন। অষ্টম গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমদও (২০০১-০৫) একাধারে অর্থনীতির শিক্ষক, আমলা ও বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তা ছিলেন। নবম গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদও (২০০৫-০৯) ছিলেন তা–ই। তিন সরকার (বিএনপি, তত্ত্বাবধায়ক ও আওয়ামী লীগ) আমলের গভর্নর তিনি।

দশম গভর্নর আতিউর রহমান (২০০৯-১৬) একজন অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষক। একাদশ গভর্নর ফজলে কবির (২০১৬-২২) সাবেক আমলা। তিনি অর্থসচিব ছিলেন এবং গভর্নর পদে নিয়োগ পাওয়ার আগে ছিলেন সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান। দ্বাদশ গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারও (২০২২-২৪) ছিলেন আমলা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগে ব্যতিক্রম ঘটনা আছে ইংল্যান্ডে। ২০০৮ থেকে ২০১৩ সময় পর্যন্ত মার্ক কার্নি ছিলেন ব্যাংক অব কানাডার (কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংক) গভর্নর। তিনি একজন বিনিয়োগ ব্যাংকার এবং কানাডার নাগরিক। ২০০৭-০৮ সময়ে বিশ্বমন্দা দেখা দিলে ওই মন্দার কবল থেকে কানাডাকে সফলভাবে রক্ষা করেন মার্ক কার্নি, এ ব্যাপারে তাঁর বিশ্বখ্যাতি হয়। ব্রিটিশ সরকার ভিনদেশি মার্ক কার্নিকে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর পদে নিয়োগ দেয়। ২০১৩ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর ছিলেন মার্ক কার্নি।

বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনার জন্য ৮ থেকে ৯ সদস্যের একটি পরিচালনা পর্ষদ থাকে, পদাধিকারবলে গভর্নর এ পর্ষদের চেয়ারম্যান। সদস্য থাকেন একজন ডেপুটি গভর্নর। এ ছাড়া অর্থসচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান পদাধিকারবলে সদস্য হন। বাকিদের নেওয়া হয় বাইরে থেকে।

১৯৯৬ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার একটি ব্যাংক সংস্কার কমিটি গঠন করেছিল। ১৯৯৯ সালে সেই কমিটির প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গভর্নর, ডেপুটি গভর্নর, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালকদের তালিকা তৈরির জন্য একটি জাতীয় ব্যাংকিং উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের সুপারিশ ছিল। গভর্নরের সর্বোচ্চ মেয়াদ পাঁচ বছর এবং তা আর না বাড়ানোর সুপারিশও করা হয়েছিল সেখানে। গভর্নরের পদমর্যাদা সুপ্রিম কোর্টের বিচারকের সমান হবে, সে কথাও বলা হয়েছিল। ওই সরকার এবং এর পরের কোনো সরকারই তা মানেনি।

আহসান এইচ মনসুর গভর্নর থাকাকালীন গত বছরের অক্টোবরে তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের কাছে প্রস্তাব দিয়ে বলেছিলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধন করে গভর্নরের পদমর্যাদা দেশের একজন পূর্ণ মন্ত্রীর সমান করা উচিত। তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সরকারের প্রতিনিধি কমানোর প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। সালেহউদ্দিন আহমেদ এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার রাজনৈতিক সরকারের ওপর দিয়ে গেছেন।

city-bank
city-bank