নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর করের চাপ কমাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা ধীরে ধীরে বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। একই সঙ্গে করদাতাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে বহু বছরের জন্য কর ঘোষণা বা ট্যাক্স ডিক্লারেশন ব্যবস্থা চালুর বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।
এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও চলমান জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) এবং অন্যান্য পরিবেশবান্ধব পরিবহনে কর প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনাও করছে সরকার।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গতকাল সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিভিন্ন করসংক্রান্ত প্রস্তাব উপস্থাপন করলে সেগুলো নীতিগতভাবে অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বর্তমানে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা আগামী দুই অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারিত রয়েছে। তবে সরকার এটি ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ভবিষ্যতে ৪ লাখ টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপের অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সম্পদ কর পুনর্বহালের চিন্তা
বৈঠকে সম্পদ কর বা ওয়েলথ ট্যাক্স পুনরায় চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, এ ধরনের কর যেন শুধুমাত্র নিয়মিত আয়ের ওপর নির্ভরশীল সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি না করে। উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর প্রভাব যতটা সম্ভব কম রাখাই সরকারের মূল লক্ষ্য।”
নিত্যপণ্যে কর ছাড়ের ইঙ্গিত
কর্মকর্তারা জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু পণ্যকে নিম্ন করস্ল্যাবের আওতায় আনার চিন্তা করা হচ্ছে। কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে একক ০.৫ শতাংশ উৎস কর আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে করব্যবস্থা সহজ হয় এবং ভোক্তাদের ওপর চাপ কমে।
টার্নওভার কর বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের মতে, সরকারের মূল লক্ষ্য করহার বাড়ানো নয়, বরং করের আওতা সম্প্রসারণ করা।
মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশায় আসছে এআইটি
প্রথমবারের মতো মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশার ওপর অগ্রিম আয়কর (এআইটি) আরোপের পরিকল্পনা করছে সরকার।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ১১১ সিসি থেকে ১২৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেলের জন্য বার্ষিক কর ১ হাজার টাকা, ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসির জন্য ৩ হাজার টাকা এবং ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলের জন্য ৫ হাজার টাকা নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
এ ছাড়া মোটরসাইকেল, বৈদ্যুতিক যানবাহন এবং ব্যাটারিচালিত যানবাহনের কর ও নিয়ন্ত্রণনীতি নিয়ে সমন্বিত কাঠামো তৈরির কাজও চলছে।
ব্যাংক আমানতে বাড়ছে শুল্ক অব্যাহতির সীমা
আগামী অর্থবছর থেকে ব্যাংক আমানতের আবগারি শুল্ক অব্যাহতির সীমা ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাবও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, তামাকজাত পণ্য ও বিদেশি মদের দাম বাড়তে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এর মাধ্যমে একদিকে ভোগ নিরুৎসাহিত করা এবং অন্যদিকে রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
বিলাসবহুল গাড়িতে বাড়ছে কর
৩ হাজার ৫০০ সিসির বেশি ইঞ্জিন ক্ষমতাসম্পন্ন বিলাসবহুল ব্যক্তিগত গাড়ির অগ্রিম আয়কর ২ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে ১ হাজার ৫০০ সিসি পর্যন্ত ইঞ্জিন ক্ষমতাসম্পন্ন যানবাহনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ২৫ হাজার টাকার অগ্রিম আয়কর অপরিবর্তিত থাকবে।
কর্মকর্তারা জানান, কালো টাকা বৈধকরণ ও বিশেষ বিনিয়োগ সুবিধা সংক্রান্ত আলোচনা এখনো চলমান রয়েছে এবং এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সরকারের মতে, আসন্ন বাজেটের এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য হচ্ছে—রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং পরিবেশবান্ধব অর্থনীতিতে রূপান্তরের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা।












