দায়িত্ব নেওয়ার পর দিন থেকেই দেশের জনপ্রিয় মোবাইল আর্থিকপ্রতিষ্ঠান নগদকে চাপে রাখতে এমনকি ধ্বংস করে ফেলতে নানান কায়দাকানুন বের করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। এক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনের তোয়াক্কা না করা, নগদের ওপর খড়গহস্ত হতে আইনে নতুন করে বিধান যুক্ত করা, নিজের প্রতিষ্ঠানেরলোকদের দিয়ে নগদের বোর্ডে সাজানো – কোনো কিছুই বাকি রাখেননি তিনি।
নানান চক্রান্তে একের পর এক ব্যর্থ হয়েও হতোদ্দোম হননি আহসানএইচ মনসুর। বরং নতুন করে আরেক চক্রান্ত হাজির করেছেন। নগদবিক্রি করে দেওয়া বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া – এসব চেষ্টাও তিনি বাদ দেননি। আর এর সবই তিনি করেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী বিকাশকে ফাকা মাঠে গোল দেওয়ার পরিকল্পনা থেকে। বিকাশ যাতে একচেটিয়া ব্যবসা করতে পারে সে লক্ষ্যে শুরু থেকেই ষড়যন্ত্রের জালবিস্তার ঘটাতে থাকেন তিনি।
দায়িত্ব পেয়ে প্রথম সুযোগেই নগদের ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স স্থগিত করেন। অন্যদিকে আবার বিকাশকে তড়িঘড়ি করে লাইসেন্স দিতেও উদ্দত হয়ে ওঠেন আহসান এইচ মনসুর। নতুন সরকার শপথ নেওয়ারঠিক আগের দিন হঠাৎ করেই জরুরী বৈঠক ডাকেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নজিরবিহীন প্রতিবাদের মুখে এই যাত্রায় আর বিকাশকে লাইসেন্স দিতে পারেননি তিনি।
মূলত বিকাশের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা, বিকাশের মূল প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক ব্যাংকের বোর্ড চেয়ারম্যান হিসেবে বিশেষ সুবিধানেওয়া মিলিয়ে বিকাশের চলার পথটাকে মসৃন করতে চেয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। শুরু থেকে এটাই ছিল তার লক্ষ্য। আর সেজন্য সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী নগদ তার কাছে চক্ষুশূল।
গভর্নরের দায়িত্ব পাওয়ার আগেও নিজের প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউ (পিআরআই) নিয়মিত ভিত্তিতে আলোচনা সভার আয়োজন করে নগদের সমালোচনা এবং বিকাশের পক্ষে প্রচারণা চালানো ছিল আহসান এইচ মনসুরের একটি রুটিন কাজ। আর ২০২৪ সালেরআগস্টে দায়িত্ব পেয়ে তো তিনি নগদকে তার প্রধান এজেন্ডা বানিয়ে ফেলেন। নগদ নিয়ে মিডিয়াতে যতো নেতিবাচক কথা তিনি বলেছেন, তাতে গ্রাহকদের ভালোবাসা না থাকলে এতোদিন প্রতিষ্ঠানটি টিকতো নাবলে মনে করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগদের এক কর্মকর্তা।
প্রশাসক নিয়োগে আইনের ভূতাপেক্ষ অনুমোদন
২০২৪ সালের আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে দায়িত্ব পেয়েই প্রথমেই আইনবিরুদ্ধ কাজ করে নগদে প্রশাসক নিয়োগ করেন আহসান এইচ মনসুর। পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আইন-এর অধীনে নগদে ১০ জনের প্রশাসক দল নিয়োগের চিঠি দেওয়া হলেও তখনো এমন কোনো আইন দেশে বিদ্যমান ছিল না। বিষয়টি নিয়ে তখন অনেক সমালোচনা হলেওপরে আইনটির ভূতপেক্ষ অনুমোদন দেওয়া হয়।
এমনকি ওই আইনের যে ধারা উল্লেখ করা হয়, তাতে প্রশাসক নিয়োগের আগে কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করার কথা রয়েছে। সময় দিয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠাতে হবে। উত্তরে সন্তুষ্ঠু না হলে তখনই কেবল প্রশাসক দেওয়া যাবে। এক্ষেত্রে কার্যকর না হওয়া একটি আইনকে রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখ করা হলেও সেখানেও শর্টকাট করে নিজের সুবিধামতো প্রশাসক নিয়োগ করা হয়।
আইনানুগ না হওয়ায় পরে উচ্চ আদালত প্রশাসক নিয়োগের এই পুরো প্রক্রিয়াকে অবৈধ ঘোষণা করে। কিন্তু সে সময়ের সরকারি ক্ষমতাব্যবহার করে বিষয়টিকে আবার ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে বলে জানায় সূত্র।
বিকাশের লোক দিয়ে নগদের বোর্ড গঠন
নগদকে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের জন্ম তিনি দিয়েছেন বিকাশ, ব্র্যাক এবং পিআরআই সংশ্লিষ্ট লোক লোকদেরকে দিয়ে নগদের পরিচালনা পর্ষদ গঠনের মাধ্যমে। বোর্ডের প্রধান করা হয় বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. কেএএস মুরশিদকে। ওই কেএএস মুরশিদ এর আগে বিকাশের পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। এর মধ্যে বিকাশের পৃষ্ঠপোশকতায় বিআইডএস থেকে এমএফএস বিষয়ে একটি গবেষণাও করেন তিনি। ওই গবেষণার ক্ষেত্রে সহ গবেষক ছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো খন্দকার সাখাওয়াত আলী। তাকেও বোর্ডের সদস্য করা হয়। খন্দকার সাখাওয়াত আলী আহসান এইচ মনসুরের প্রতিষ্ঠান পিআরআই-এর সঙ্গে নানান ভাবে যুক্ত। তাছাড়া পিআরআই-এর রিসার্চ ডাইরেক্টর ড. বজলুল হক খন্দকারকে বোর্ডের সদস্য করা হয়।
এসব করার মাধ্যমে তিনি আসলে শুরু থেকেই নগদে নিজের কর্তৃত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করেন বলে নিশ্চিত করে সূত্র।
পুরো বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। সমালোচনায় এক পর্যায়ে বোর্ডকে সামান্য পুনগঠন করেন তিনি।
২৩’শ কোটি টাকার ‘অনিয়ম’ চক্রান্ত
নগদে এসেই প্রশাসকরা তথাকথিত অনিয়ম খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পরেতারা মনগড়া দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকার একটি গালগল্প তৈরী করে। গত দেড় বছর ধরে আসন এইচ মনসুর এই দুই হাজার ৩০০ কোটিটাকার গল্পই বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমকে বলে বেড়াচ্ছেন। ফলে নগদের ব্যবসায়িক ক্ষতি হচ্ছে।
ইতিমধ্যে তারা নগদে ফরেনসিক অডিট করানোর জন্য অডিটর নিয়োগ করেছে। মাসের পর মাস নগদের অফিসে বসে অডিটর টিম তাদের নিজেদের ইচ্ছে মতো নগদের সকল তথ্য যাচাই বাছাই করেছে। জানা গেছে, অডিটর কোম্পানি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। কিন্তু সেই অডিটে যেহেতু আহসান এইচ মনসুর যেমন তথ্য চেয়েছিলেন তাআসেনি ফলে এবিষয়ে তিনি আর কোনো কথা বলেন না।
ভুয়া এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নগদের বেশ কয়েক জন শেয়ারহোল্ডারের বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়। কিন্তু যে তথ্যের কোনো ভিত্তি নাইসে মামলা তো বেশী দূর এগুতে পারে না। সে কারণে বিষয়টি এক রকমচাপা পড়েই আছে। তবে নগদের শেয়ার হোল্ডারদেরকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবেই এ মামলা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে সূত্র।
অবৈধভাবে বিক্রির চেষ্টা
নগদকে বিক্রি করে দেওয়ার চেষ্টাও গত এক বছরের বেশী সময় ধরে করে আসছেন আহসান এইচ মনসুর। এ প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) মাধ্যমে দরপত্র আহবান করা হয়। তবে পুরোপ্রক্রিয়াকে অবৈধ ঘোষণা করে আদালত। গত বছর ১১ সেপ্টেম্বর এই আদালতের এই আদেশের পর কিছু দিন সব চুপচাপ থাকলেও সম্প্রতিআবার বিষয়টি নিয়ে সরগরম হয়েছেন তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রবলছে, আহসান এইচ মনসুর জানেন যে গভর্ণর হিসেবে তার সময় শেষহয়ে এসেছে। সে কারণে দ্রুততার সঙ্গে তার মূল্য অ্যাসাইনমেন্টগুলো শেষ করে যেতে চান তিনি। বিকাশকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া এবং নগদকে বিক্রি করে দেওয়া তার প্রধানতম অ্যাসাইনমেন্টের অংশ।
অর্থনীতি পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নগদ নিয়ে গত দেড় বছর ধরে গভর্নর যা করেছেন সেটি সরকারের জন্যে এমন কি গোটা দেশের জন্যেইলজ্জার। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মতো একটি সম্মানিত চেয়ারে বসে তিনি এতোটা হীনমন্য আচরণ করবেন বা ব্যক্তিগত আক্রশের বসে একটি উদীয়মান কোম্পানিকে ধ্বংস করার চেষ্টা করবেন সেটি ভাবতেওকষ্ট হয়।
তারা বলেন, ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং একীভূত করারক্ষেত্রে দূর্বল ব্যাংকের তালিকা করতে গিয়েও তিনি আর্থিক অসততার পরিচয় দিয়েছেন বলে শোনা যায়। এটি বিস্ময়কর। ভালো ব্যাংককে এইতালিকায় যুক্ত করে দূর্বল ব্যাংককে বাইরে রাখা তার নামে ওঠাঅভিযোগের সত্যতার প্রমাণ দেয়। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে বিষয়টিরদিকে নজর দেওয়া উচিৎ বলেও মনে করেন তারা।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেলার কাউন্সিলও গভর্নরের এই স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিবাদ করেছেন। কাউন্সিলের সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণও সংবাদ সম্মেলন করে আহসান এইচ মনসুরের যথেচ্চার সিদ্ধান্তের সমালোচনাকরেন।
সূত্র জানিয়েছে, গভর্নর এবং তার বর্তমান স্ত্রীর আর্থিক অসততার বিষয়টি এখন বাংলাদেশ ব্যাংকে ওপেন সিক্রেট। তার পক্ষপাতিত্বের সিদ্ধান্ত এবং স্বেচ্ছাচারিতার কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা প্রতিবাদ করতেই শুরু করেছেন।













