ঢাকা || ০৭ মার্চ ২০২৬

নগদকে দুর্বল করতে চক্রান্তের অভিযোগ সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের বিরুদ্ধে

নগদকে দুর্বল করতে চক্রান্তের অভিযোগ সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের বিরুদ্ধে

ব্যাংক ইনফো

প্রকাশিত: ১৩:৫৩, ৭ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশ ব্যাংক–এর সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দেশের জনপ্রিয় মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান নগদ–কে দুর্বল করে দেওয়ার নানা পদক্ষেপ নেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রশাসক নিয়োগ থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে সেই সিদ্ধান্তকে বৈধতা দিতে আইনকে ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকর করার উদ্যোগও নেওয়া হয়।

সূত্র জানায়, গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নগদের পরিচালনা কাঠামোতে পরিবর্তন আনা, বোর্ড পুনর্গঠন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য ছিল নগদের ব্যবসাকে সংকুচিত করা এবং বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া।

প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক

২০২৪ সালের ২১ আগস্ট নগদে সাত সদস্যের একটি প্রশাসক দল নিয়োগ করা হয়। এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় পরিশোধ ও নিষ্পত্তি ব্যবস্থা আইন–এর অধীনে। তবে তখন ওই আইন কার্যকর ছিল না বলে আইন বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তোলেন।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে গেজেট প্রকাশ করে আইনটিকে ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকর করা হয়। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এর মাধ্যমে আগের সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

আইনজীবী ব্যারিস্টার মোস্তাফিজুর রহমান খান বলেন, যে আইনের অধীনে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, সেই আইন তখন কার্যকর ছিল না। পরে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে তা ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকর করা হয়েছে, যা আইনগতভাবে বিতর্কিত।

তিনি আরও বলেন, প্রশাসক নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার বিধান থাকলেও নগদের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি।

বোর্ড পুনর্গঠন নিয়ে প্রশ্ন

প্রশাসক নিয়োগের পর নগদের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। নতুন বোর্ডের প্রধান করা হয় ড. কেএএস মুরশিদ–কে, যিনি আগে বিকাশ–এর পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন বলে জানা যায়।

এ ছাড়া বোর্ডে যুক্ত করা হয় গবেষক খন্দকার সাখাওয়াত আলী–কে, যিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)-এর ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো। একই সঙ্গে ড. বজলুল হক খন্দকার–কেও বোর্ডের সদস্য করা হয়, যিনি পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যুক্ত।

সমালোচকদের মতে, এসব নিয়োগের মাধ্যমে নগদের পরিচালনায় বাইরের প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে।

লাইসেন্স ও ব্যবসা সংকোচনের অভিযোগ

সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমদিকেই নগদের ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়। একই সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগও ওঠে।

পরে নতুন সরকার শপথ নেওয়ার আগমুহূর্তে একটি জরুরি বৈঠক ডাকা হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের প্রতিবাদের মুখে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।

গ্রাহক ও লেনদেনে প্রভাব

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্টে নগদের নিবন্ধিত গ্রাহক ছিল প্রায় ৯ কোটি ৭৬ লাখ। গত দেড় বছরে তা কমে ৭ কোটি ৬৩ লাখে নেমে এসেছে।

এ ছাড়া আগে দৈনিক লেনদেন হাজার কোটি টাকার বেশি থাকলেও বর্তমানে সেই প্রবৃদ্ধি আর আগের মতো নেই। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও নেতিবাচক বক্তব্যের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান নগদের মাধ্যমে পেমেন্ট গ্রহণে অনীহা দেখিয়েছে।

সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়া

অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, একটি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের প্রধানের কাছ থেকে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এ ধরনের অবস্থান প্রত্যাশিত নয়।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল–এর নেতারাও সাবেক গভর্নরের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। সংগঠনটির সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ এক সংবাদ সম্মেলনে এসব সিদ্ধান্তকে স্বেচ্ছাচারী বলে উল্লেখ করেন।

অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, নগদকে ঘিরে গত দেড় বছরে নেওয়া পদক্ষেপগুলো নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন, যাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিরপেক্ষতা ও আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায়।

city-bank
city-bank