ঢাকা || ০৭ মার্চ ২০২৬

‘নগদ’কে ঘিরে গালগল্প ও আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ তৈরির অভিযোগ সাবেক গভর্নরের বিরুদ্ধে

‘নগদ’কে ঘিরে গালগল্প ও আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ তৈরির অভিযোগ সাবেক গভর্নরের বিরুদ্ধে

ব্যাংক ইনফো

প্রকাশিত: ১৩:৫৬, ৭ মার্চ ২০২৬

দেশের জনপ্রিয় মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান নগদ–কে দুর্বল করতে নানা কৌশল নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ ব্যাংক–এর সদ্য সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর–এর বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, নগদের বিরুদ্ধে আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া এবং বিভিন্ন তদন্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হয়।

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব পান ড. আহসান এইচ মনসুর। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নগদকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরার প্রবণতা দেখা যায়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল—নগদের কাছে জমা থাকা অর্থের তুলনায় অতিরিক্ত ই-মানি তৈরি এবং বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগ।

তদন্ত ও মামলার মাধ্যমে চাপের অভিযোগ

অভিযোগ রয়েছে, এসব অভিযোগকে সামনে রেখে বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এক পর্যায়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তারা টেলিভিশন ক্যামেরাসহ নগদের কার্যালয়ে যান। পাশাপাশি নগদের শেয়ারহোল্ডারদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করা হয়।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট–এর মাধ্যমে নগদের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার ব্যাংক হিসাবও জব্দ করা হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল প্রতিষ্ঠানটির ওপর চাপ সৃষ্টি করা।

২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ‘অনিয়ম’ নিয়ে বিতর্ক

২০২৪ সালের ২১ আগস্ট নগদে প্রশাসক নিয়োগের পর একটি প্রশাসক দল প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পর্যালোচনা শুরু করে। পরে তারা প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ তোলে, যা নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা চলতে থাকে।

তবে নগদ কর্তৃপক্ষ বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের প্রতিষ্ঠানে কখনো ই-মানির ঘাটতি ছিল না। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি বৈধ ঋণকে ভুলভাবে ই-মানির ঘাটতি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

নগদের একজন কর্মকর্তা জানান, ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি EXIM Bank–এ থাকা ট্রাস্ট কাম সেটেলমেন্ট অ্যাকাউন্টের বিপরীতে ৩৪৫ কোটি টাকা ঋণ নেয়। সে সময় এই ধরনের ঋণ নেওয়ার বিধান ছিল। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক সেই বিধান বাতিল করলে ব্যাংকটি ঋণ সমন্বয় করে দেয় এবং সাময়িকভাবে ই-মানির ঘাটতি তৈরি হয়।

নগদ কর্তৃপক্ষ তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করে। সূত্র অনুযায়ী, প্রশাসক নিয়োগের সময় পর্যন্ত দুইটি কিস্তি—২৩ কোটি ও ২০ কোটি টাকা—পরিশোধ বাকি ছিল, যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে পরিশোধ করার কথা ছিল।

কিন্তু প্রশাসক দল দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকে চিঠি দিয়ে শেষ দুটি কিস্তির পরিশোধ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে এই ঘটনাকেই ই-মানির ঘাটতি হিসেবে তুলে ধরা হয়।

ফরেনসিক অডিট নিয়েও প্রশ্ন

এই অভিযোগের পর একটি ফরেনসিক অডিটের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে যে প্রতিষ্ঠানকে অডিটের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তারা দীর্ঘদিন ধরে নগদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছে বলে জানা যায়।

ফরেনসিক অডিটের উদ্দেশ্য ছিল আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য অনিয়ম খুঁজে বের করা। তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অডিট চলাকালে গ্রাহকদের সংবেদনশীল আর্থিক তথ্যও যাচাই করা হয়, যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।

সূত্র জানায়, অডিট প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলেও তা প্রকাশ করা হয়নি।

বিক্রির চেষ্টা নিয়েও অভিযোগ

নগদকে বিক্রি করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ–এর মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করা হয়। তবে আদালত পুরো প্রক্রিয়াকে অবৈধ ঘোষণা করে স্থগিত করে দেয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নগদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গত দেড় বছরে নেওয়া নানা সিদ্ধান্ত ও বক্তব্যের মধ্যে অনেক অসঙ্গতি রয়েছে। অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, একটি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পক্ষ থেকে এ ধরনের পদক্ষেপ আর্থিক খাতের জন্য উদ্বেগজনক।

তাদের মতে, নগদকে ঘিরে গত দেড় বছরে যা ঘটেছে, তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে আর্থিক খাতে নীতিগত স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা যায়।

city-bank
city-bank