দেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণ একটি নির্দিষ্ট পক্ষের হাতে তুলে দিতে সচেতনভাবে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ ব্যাংক–এর সদ্য বিদায়ী গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর–এর বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, তার প্রায় দেড় বছরের দায়িত্বকালীন সময়ে দেশের বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রভাব বাড়াতে সহায়ক হয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি, তার সময়েই দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একটি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ–কে একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে যেতে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় ব্যাংকটি থেকে হঠাৎ করেই চার থেকে পাঁচ হাজার কর্মীকে বের করে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কাঠামো পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই করা হয়েছিল এবং এতে সে সময়ের গভর্নরের নীরব সমর্থন ছিল।
নির্বাচনী প্রভাবের অভিযোগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলছেন, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ–এর বিস্তৃত ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক নির্বাচনকেন্দ্রিক কার্যক্রমে ব্যবহার করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্যই এই পুনর্গঠন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
নির্বাচনের আগে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ব্যাংকটির কয়েকজন কর্মকর্তা নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে একটি নির্দিষ্ট দলের পক্ষে কাজ করার পরিকল্পনা করছেন—এমন অভিযোগও সে সময় সামনে আসে। একই সঙ্গে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতাকে ব্যবহার করে নির্বাচনী ব্যয়ের একটি অংশ কৌশলে জোগান দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নগদকে ঘিরে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা
একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে দেশের অন্যতম মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান নগদ–কে ঘিরেও। সূত্রগুলো বলছে, প্রতিষ্ঠানটিকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নগদকে একজন সংসদ সদস্যের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিন গোপনে এগোলেও একপর্যায়ে সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসে।
রাজনৈতিক আগ্রহের স্বীকারোক্তি
বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যেও মন্তব্য করেছেন মীর আহমদ বিন কাসেম, যিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–এর একজন সংসদ সদস্য হিসেবে পরিচিত। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি নগদের প্রতি তাদের আগ্রহ এবং এ বিষয়ে গভর্নরকে চিঠি দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বিডার মাধ্যমে দরপত্র
সূত্রগুলো জানায়, নগদ বিক্রির জন্য বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর মাধ্যমে একটি দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। সেই তালিকায় ব্যারিস্টার আরমানের প্রতিষ্ঠানের নামও ছিল বলে জানা যায়।
তবে আদালতের নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ায় বিডার মাধ্যমে নগদ বিক্রির পুরো প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়। এরপরও ড. মনসুরের দায়িত্বের শেষ সময়ে অন্য প্রস্তাবগুলো বাদ দিয়ে কেবল একটি নির্দিষ্ট প্রস্তাবকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মত
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ যদি রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে চলে যায়, তাহলে তা পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তাদের মতে, সাবেক গভর্নরের দায়িত্বকালীন সময়ে নেওয়া এসব সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ পুনরায় পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এতে বোঝা যাবে—কোন সিদ্ধান্ত কার স্বার্থে নেওয়া হয়েছিল এবং তা দেশের আর্থিক খাতের জন্য কতটা প্রভাব ফেলেছে।
সূত্রগুলো বলছে, প্রায় ১০ কোটি গ্রাহকের তথ্যভাণ্ডার রয়েছে নগদ–এর কাছে। এমন একটি বৃহৎ ডিজিটাল আর্থিক প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণ যে কোনো রাজনৈতিক শক্তির জন্য বড় কৌশলগত সুবিধা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, নির্বাচনের আগে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার চেষ্টা এবং নগদের মালিকানা পরিবর্তনের উদ্যোগ—এসব সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত গভর্নরের বিদায়কে ত্বরান্বিত করেছে বলে অনেকের ধারণা।













