ঢাকা || ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

মূল্যস্ফীতি চাপে নীতিসুদ অপরিবর্তিত রাখল বাংলাদেশ ব্যাংক

মূল্যস্ফীতি চাপে নীতিসুদ অপরিবর্তিত রাখল বাংলাদেশ ব্যাংক

মূদ্রানীতি ঘোষণা করেন ড. আহসান এইচ মনসুর

ব্যাংক ইনফো

প্রকাশিত: ০০:২৬, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধেও কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন মুদ্রানীতি বিবৃতি (এমপিএস) অনুযায়ী নীতিসুদহার অপরিবর্তিত রেখে ১০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে।

সোমবার জানুয়ারি–জুন সময়কালের জন্য নতুন এমপিএস ঘোষণা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তবে বিনিয়োগ স্থবিরতা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর কিছু উদ্দীপনামূলক পদক্ষেপের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বলা হয়, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার ইঙ্গিত থাকলেও প্রক্রিয়াটি এখনো অস্থির এবং তুলনামূলকভাবে উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। এ অবস্থায় নীতিসুদহার কমানো যুক্তিযুক্ত হবে না। বিশেষ করে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা জরুরি, কারণ এতে আমদানি-নির্ভর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। নীতিসুদহার কমালে বিনিময় হারে অবমূল্যায়নের চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, রমজান মাস এবং নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণার সম্ভাবনা নিকটমেয়াদে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এসব কারণে সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ মুদ্রানীতি প্রয়োজন।

এমপিএস অনুযায়ী, নীতিসুদ ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার পাশাপাশি স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ দশমিক ৫ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে। তবে স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) হার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৮ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামানো হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এসডিএফ হার কমানোর উদ্দেশ্য হলো আন্তঃব্যাংক মানি মার্কেট ও বেসরকারি খাতে ঋণ ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে গতি আনা। বর্তমানে অনেক ব্যাংক উদ্বৃত্ত তারল্য বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রেখে সুদ নিচ্ছে, যা উৎপাদনমুখী খাতে যাচ্ছে না।

মুদ্রানীতিতে অর্থ সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রাতেও সংশোধন আনা হয়েছে। ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ব্রড মানি (এম২) প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ, যদিও বাস্তবে তা ইতোমধ্যে ৯ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। জুন ২০২৬ পর্যন্ত এম২ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়ে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে, যা আগে ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

এ ছাড়া সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ২১ দশমিক ৬ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগে ছিল ১৮ দশমিক ১ শতাংশ। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রক্ষেপণ ৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে।

গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করাই এখন প্রধান লক্ষ্য। গত সাত মাসে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার কিনে বাজারে ৫০০ বিলিয়ন টাকার বেশি তারল্য সরবরাহ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “এটি ব্যয় মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা নয়। কারণ নামমাত্র জিডিপি ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা বিবেচনায় নিলে অর্থ সরবরাহ এখনো সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে।”

সরকারি ব্যাংক ঋণ বৃদ্ধির ঝুঁকি প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো রাজস্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে সমন্বয় না হলে সরকারি ঋণ বাড়বে, যা বেসরকারি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতোমধ্যে ২৮ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে সাবেক বিশ্বব্যাংক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এখন সুদহারভিত্তিক মুদ্রানীতিতে গেছে, যেখানে নির্দিষ্ট লক্ষ্য নয়, কেবল প্রক্ষেপণ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমান মূল্যস্ফীতি মূলত সরবরাহপক্ষের কারণে হচ্ছে, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ সীমিত। তিনি বলেন, এই এমপিএসে কিছুটা শিথিলতা দেখা যাচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতি কমানোর ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

মুদ্রানীতির প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনটি বলেছে, দীর্ঘদিনের কঠোর মুদ্রানীতির পরও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি; বরং উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। নির্বাচনের প্রাক্কালে তারা আর্থিক ও রাজস্ব নীতির সমন্বয়ে আরও বাস্তবমুখী ও প্রবৃদ্ধিবান্ধব নীতি গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।

city-bank
city-bank