ঢাকা || ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ সংশোধন: সময়, ক্ষমতা ও স্বাধীনতার টানাপোড়েন

বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ সংশোধন: সময়, ক্ষমতা ও স্বাধীনতার টানাপোড়েন

ব্যাংক ইনফো

প্রকাশিত: ২২:০৯, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে যখন রাষ্ট্রের প্রায় সব খাতই এক ধরনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ সংশোধন নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ একটি মৌলিক আইন—এই বাস্তবতা সামনে রেখে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ আইনে ব্যাপক সংশোধনী আনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে পাঠানো এক আধা সরকারি (ডিও) চিঠিতে অর্থ উপদেষ্টা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সীমিত রাজনৈতিক বৈধতা ও সময়ের মধ্যে এমন একটি মৌলিক আইনে বড় ধরনের পরিবর্তন বাস্তবসম্মত নয়। তাঁর মতে, নির্বাচনের পর দায়িত্ব নেওয়া রাজনৈতিক সরকারের সময় বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা—আসল সমস্যা কোথায়?

অর্থ উপদেষ্টার চিঠির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি বিদ্যমান বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অপারেশনাল ও ফাংশনাল স্বাধীনতা যথেষ্ট রয়েছে বলে মনে করেন। তাঁর ভাষায়, সরকারের পক্ষ থেকে নীতিনির্ধারণ বা দৈনন্দিন কার্যক্রমে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা হয় না।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—আইনি স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে বাংলাদেশ ব্যাংক কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পেরেছে? সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খেলাপি ঋণ, ব্যাংক কেলেঙ্কারি, দুর্বল তদারকি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোকে অনেকেই দেখছেন প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার একটি সুযোগ হিসেবে।

গভর্নরের মন্ত্রী মর্যাদা: মর্যাদা না ক্ষমতা?

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবিত সংশোধনীর সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো গভর্নরের পদমর্যাদা পূর্ণ মন্ত্রীর সমমর্যাদায় উন্নীত করার প্রস্তাব। গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের যুক্তি, এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা বাড়বে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব শক্তিশালী হবে এবং নীতিগত স্বাধীনতা আরও সুসংহত হবে।

তিনি এ ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২১ সালের ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনতা কাঠামো’র সুপারিশের কথা উল্লেখ করেছেন।

তবে সমালোচকদের মতে, পদমর্যাদা বাড়ানোই স্বাধীনতার মূল সমাধান নয়। বরং নিয়োগ ও অপসারণ প্রক্রিয়া, জবাবদিহি কাঠামো এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণই এখানে মুখ্য বিষয়।

পর্ষদ কাঠামো পরিবর্তনের প্রস্তাব: ক্ষমতার ভারসাম্য কি বদলাবে?

খসড়া সংশোধনীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সরকারের প্রতিনিধিত্ব তিনজন থেকে কমিয়ে একজন এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞ সদস্য চারজন থেকে বাড়িয়ে ছয়জন করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে পর্ষদে সরকারের সরাসরি প্রভাব কমবে—এমনটাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাবি।

কিন্তু অর্থ উপদেষ্টার চিঠিতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, এমন কাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত আলোচনা ও অংশীজনদের মতামত প্রয়োজন। কারণ, পর্ষদ কাঠামোর পরিবর্তন সরাসরি নীতিনির্ধারণ ও তদারকি ক্ষমতার ভারসাম্যে প্রভাব ফেলে।

নিয়োগ ও অপসারণ: সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গা

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাব অনুযায়ী, গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিয়োগে তিন সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে এবং অপসারণের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতির নেতৃত্বে কমিটির মাধ্যমে অভিযোগ পর্যালোচনার প্রস্তাব রয়েছে।

এগুলো নিঃসন্দেহে স্বচ্ছতা ও পেশাদারত্ব বাড়ানোর উদ্যোগ। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এমন সংবেদনশীল কাঠামো চালু করা হলে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সরকার তা মেনে নেবে কি না—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

অন্তর্বর্তী সরকার বনাম দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার

এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—অন্তর্বর্তী সরকার কতদূর পর্যন্ত কাঠামোগত সংস্কার করতে পারে? গভর্নর আহসান এইচ মনসুর যেখানে বর্তমান সময়কে “সবচেয়ে উপযুক্ত” বলে মনে করছেন, সেখানে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলা এমন সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সরকারের সময় হওয়াই সঠিক।

দুই পক্ষের অবস্থানই যুক্তিহীন নয়। একদিকে রয়েছে আর্থিক খাত সংস্কারের জরুরি প্রয়োজন, অন্যদিকে রয়েছে গণতান্ত্রিক বৈধতা ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার প্রশ্ন।

বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ সংশোধন নিয়ে এই বিতর্ক মূলত আইন সংশোধনের চেয়েও বড় একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা কাগজে-কলমে থাকবে, নাকি বাস্তবেও কার্যকর হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মিলবে না। তবে অর্থ উপদেষ্টা ও গভর্নরের এই প্রকাশ্য মতভেদ ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সরকারের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে যাচ্ছে—বাংলাদেশ ব্যাংক সংস্কার আর বিলম্বিত করার সুযোগ নেই, কিন্তু তা হতে হবে সময়োপযোগী, অংশগ্রহণমূলক ও রাজনৈতিকভাবে বৈধ প্রক্রিয়ায়।

city-bank
city-bank