রাজস্ব বোর্ডকে বিভক্ত করার বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করা হলেও সচিবালয়ে জনবল অনুমোদন নিয়ে আমলাদের মধ্যে মতবিরোধের কারণে এখনো এর বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয়নি। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে এই প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণই থেকে যেতে পারে।
রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, নতুন দুটি বিভাগের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল চেয়ে একটি নতুন অর্গানোগ্রাম জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে অচলাবস্থার কারণে সেটি সেখানে আটকে আছে।
তাদের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে মাত্র দুই কর্মদিবস থাকায় বিভাজন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
অন্তর্বর্তী সরকার তাদের মেয়াদকালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে নীতি নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনা—এই দুই পৃথক বিভাগে ভাগ করার উদ্যোগ নেয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)সহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক ঋণদাতা সংস্থা দীর্ঘদিন ধরেই রাজস্ব আহরণ বাড়ানো ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এ বিভাজনের সুপারিশ করে আসছে।
গত বছরের মে মাসে সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করে দুটি বিভাগ গঠনের ঘোষণা দেয়। তবে এতে রাজস্ব ক্যাডারের কর্মকর্তারা আপত্তি তোলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, এতে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা রাজস্ব বিভাগের শীর্ষ পদে বসার সুযোগ পাবেন।
প্রতিবাদের মুখে সরকার সেপ্টেম্বর মাসে সংশোধিত অধ্যাদেশ জারি করে, যাতে নতুন বিভাগগুলোর শীর্ষ পদে রাজস্ব ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়।
এরপর গত ২১ জানুয়ারি উপদেষ্টা পরিষদ ব্যবসাবিধির প্রয়োজনীয় সংশোধনী অনুমোদন করে। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের সংশোধনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে সচিবদের প্রশাসনিক উন্নয়ন কমিটির (এসসিএডি) অনুমোদন প্রয়োজন হয়।
কিন্তু নথি অনুযায়ী, অর্থ মন্ত্রণালয় নির্বাচনসংক্রান্ত ব্যস্ততার কথা উল্লেখ করে কমিটি ডাকা সম্ভব হয়নি দাবি করে সংশোধনীটি সরাসরি প্রধান উপদেষ্টার কাছে পাঠায়।
তবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক অতিরিক্ত সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সংশ্লিষ্ট কমিটির বৈঠক ওই দিনই বিকেল ৩টায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তার ভাষ্য, “এতে স্পষ্ট যে অর্থ মন্ত্রণালয় ইচ্ছাকৃতভাবে প্রশাসনের ভেতরে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে।”
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া বলেন, নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান চালু করতে হলে জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি সচিব কমিটির অনুমোদনও বাধ্যতামূলক।
তিনি বলেন, “এটি একটি অত্যন্ত মানক প্রক্রিয়া এবং অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে।”
গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জন প্রশাসনে “অভূতপূর্ব বিশৃঙ্খলা” তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তার মতে, এনবিআর বিভাজনের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। “এটি বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা আরও বাড়তে পারে,” বলেন তিনি।
সাবেক সচিব ও লেখক-গবেষক আবদুল আওয়াল মজুমদার বলেন, প্রতিষ্ঠিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া উপেক্ষা করা একটি উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত।
তিনি বলেন, “বিএনপি সরকারের সময় প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে পাশ কাটিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত অনুমোদন করলেও পরে তা বাতিল করা হয়েছিল। সরকারের মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
তিনি বলেন, “এখন এই সংবেদনশীল বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না।”
তবে এর আগে তিনি এবং অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিভাজন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, তাদের পক্ষ থেকে সব প্রক্রিয়া শেষ করা হয়েছে।
“প্রশাসন ক্যাডারের সহযোগিতা না পাওয়ায় এই শেষ ধাপটি আটকে আছে। এটি খুবই হতাশাজনক,” বলেন তিনি।
তার মতে, আসন্ন নির্বাচনের কারণেই বিলম্ব হচ্ছে। এক–দুই মাস আগেই কাজটি শেষ করা গেলে এ পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতো।
আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে বিভাজন উদ্যোগ
এদিকে, উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদনের কয়েকদিন পর গত ১ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব তানভীর আহমেদ সাতজন সচিবের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। এর মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধান সচিবও রয়েছেন।
রিটে এনবিআর বিভাজন প্রক্রিয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়।
তানভীর আহমেদ বলেন, নীতিনির্ধারণী সংস্থা হিসেবে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ বর্তমানে “যথেষ্ট শক্তিশালী নয়”।
তার মতে, বিভাগটিকে শক্তিশালী করেই এবং প্রয়োজনে বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো সম্প্রসারণ করেই সমস্যার সমাধান করা যেত। এতে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ও খুব বেশি বাড়ত না এবং অধ্যাদেশ জারির প্রয়োজন হতো না।
“মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে পাশ কাটিয়ে তড়িঘড়ি করে এই উদ্যোগ নেওয়ায় অনেক প্রশ্ন উঠেছে। সব দিক বিবেচনা করেই একজন সচেতন নাগরিক ও সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আমি রিট করেছি,” বলেন তিনি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, এনবিআর বিভাজন একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার হলেও এটি সতর্কতা ও টেকসই পরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
তার মতে, একে সরকারের কৃতিত্ব হিসেবে দেখানোর তাড়না সংস্কারের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলে তা উল্টো ক্ষতির কারণ হতে পারে।
তিনি বলেন, “এই সংস্কারের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে এবং একবার বাস্তবায়ন হলে তা সহজে ফেরানো যায় না।”
তিনি আরও বলেন, শ্বেতপত্রে বহুদিন ধরেই এই বিভাজনের সুপারিশ ছিল এবং এটি আইএমএফের সংস্কার এজেন্ডার অংশ হলেও অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে দেশে রাজনৈতিক বিতর্ক খুব কম হয়।
তার মতে, রাজনৈতিক ঐকমত্য ও শক্ত ভিত্তি ছাড়া বিদায়ী সরকারের তড়িঘড়ি উদ্যোগ ভবিষ্যতে উল্টো জটিলতা তৈরি করতে পারে।













