বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন
একই সঙ্গে ব্যবসায়ী, নীতিনির্ধারক ও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় থাকার ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকারের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের শাসনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিএএবি)–এর নথি ও সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শেখ বশির উদ্দিন—যিনি বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য—নিজের ব্যবসায়িক উদ্যোগের জন্য যে খাতে লাইসেন্স চেয়েছেন, পরবর্তীতে সেই খাতেরই দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা এবং রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চেয়ারম্যান হয়েছেন।
২০২৫ সালের মার্চ মাসে সিএএবি একটি নতুন বিমান চলাচল লাইসেন্সের আবেদন যাচাই করতে ভিডিও কনফারেন্সের আয়োজন করে। সেখানে আবেদনকারী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শেখ বশির উদ্দিন, যিনি তখন অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন।
সিএএবি সূত্র অনুযায়ী, বশির উদ্দিনের মালিকানাধীন আকিজ–বশির গ্রুপ ওই সময় “আকিজ বশির এভিয়েশন লিমিটেড” নামে একটি বি–২ শ্রেণির কোম্পানি গঠনের লক্ষ্যে একটি লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) জমা দেয়। প্রস্তাবিত কোম্পানিটির মাধ্যমে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ যাত্রী ও কার্গো পরিবহন পরিচালনার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়।
এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের ১১ মার্চ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন থেকে একটি ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করা হয়। লাইসেন্সে ব্যবসার ধরন হিসেবে ‘আমদানি, এভিয়েশন সার্ভিস ও রপ্তানি’ উল্লেখ রয়েছে এবং এতে বশির উদ্দিনের ছবি সংযুক্ত।
একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে সিএএবির কাছে নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি) ও এয়ার অপারেটর সার্টিফিকেট (এওসি) চেয়ে আবেদন করা হয়। প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ভিডিও সাক্ষাৎকারে কোম্পানির মালিক হিসেবে বশির উদ্দিন নিজেই অংশ নেন। যদিও এখনো এসব সনদ দেওয়া হয়নি, বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে বলে সিএএবি সূত্র জানিয়েছে।
এর প্রায় এক মাস পর, ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল শেখ বশির উদ্দিনকে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে যে খাতের লাইসেন্সের জন্য তিনি আবেদন করেছিলেন, সেই খাতের নীতিনির্ধারণী দায়িত্বও তার হাতে আসে।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এগুলো স্পষ্ট স্বার্থের সংঘাতের উদাহরণ। অন্তর্বর্তী সরকার হয়তো বুঝতেই পারেনি যে এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবে ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।”
তবে শেখ বশির উদ্দিন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, গণমাধ্যম ও কিছু ‘সিন্ডিকেট’ তার ব্যক্তিগত প্রয়োজনকে বাণিজ্যিক উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করছে। তিনি দাবি করেন, করপোরেট যাতায়াতের প্রয়োজনে তিনি গত ১৪ বছর ধরে একটি হেলিকপ্টারের মালিক এবং আগের অপারেটর প্রতিষ্ঠান অচল হয়ে পড়ায় তিনি বাধ্য হয়ে এওসি চেয়েছেন।
“আমি কোনো উড়োজাহাজ ব্যবসা করছি না। এটি আমার ব্যক্তিগত হেলিকপ্টার,” বলেন তিনি। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে নিজের খরচে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফ্লাইট পরিচালনার কথাও জানান তিনি।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এলওআই–তে যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকায় এটি বাণিজ্যিক বিমান চলাচলের আওতাভুক্ত। পাশাপাশি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় নিজের নামে ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ এবং নিয়ন্ত্রিত খাতে লাইসেন্স চাওয়াকে নৈতিকতার পরিপন্থী হিসেবে দেখছেন তারা।
বিমান বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, “এখানে যে সমস্যা আছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এটি স্পষ্ট স্বার্থের সংঘাত।”
বিমানের বোর্ডে নিয়োগ
২০২৫ সালের আগস্টে শেখ বশির উদ্দিন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। প্রচলিতভাবে বেসামরিক বিমান চলাচল উপদেষ্টা বা মন্ত্রীর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইন্সের বোর্ডের মধ্যে একটি দূরত্ব বজায় রাখার রীতি থাকলেও এই নিয়োগে সেই সীমারেখা ভেঙে গেছে বলে মত সংশ্লিষ্টদের।
বশির উদ্দিন দাবি করেন, তার নেতৃত্বে বিমানের টিকিটের দাম কমেছে এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, এতে নীতিনির্ধারক ও বাস্তবায়নকারী একই ব্যক্তি হওয়ায় জবাবদিহির কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে।
বোয়িং চুক্তি ঘিরে উদ্বেগ
নির্বাচনের প্রাক্কালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য ৩৭ হাজার কোটি টাকা (৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি সইয়ের প্রস্তুতিও বিতর্ক তৈরি করেছে। সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিমানের বার্ষিক সাধারণ সভায়, যেখানে সভাপতিত্ব করেন বশির উদ্দিন নিজেই।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৪টি উড়োজাহাজ কেনা হবে—এর মধ্যে রয়েছে বোয়িং ৭৮৭ ও ৭৩৭ ম্যাক্স সিরিজের বিমান। নির্বাচন সামনে রেখে এত বড় আর্থিক চুক্তি সম্পাদনের তাড়াহুড়াকে ঝুঁকিপূর্ণ বলছেন বিশ্লেষকরা।
আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিণত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পদে থাকা কঠিন হতো। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, “অন্য দেশে হলে এমন পরিস্থিতিতে পদত্যাগের প্রশ্ন উঠত।”
তবে শেখ বশির উদ্দিন দাবি করেন, তিনি দেশপ্রেম ও সদিচ্ছা থেকেই দায়িত্ব পালন করছেন এবং সমালোচনাকে ‘মানহানির চেষ্টা’ হিসেবে দেখছেন।
পর্যবেক্ষকদের মতে, শেষ পর্যন্ত লাইসেন্স বা উড়োজাহাজ কেনা যাই হোক না কেন, এসব ঘটনার সম্মিলিত প্রভাব অন্তর্বর্তী সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
ইংরেজী দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার থেকে অনুদিত।













