ঢাকা || ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ/দাবি না মানলে কলম বিরতির হুশিয়ারী

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ/দাবি না মানলে কলম বিরতির হুশিয়ারী

বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে কর্মকর্তাদের প্রতিবাদ সভা

ব্যাংক ইনফো

প্রকাশিত: ১২:৪১, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

এবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের বিরুদ্ধে গুরুতর একগুচ্ছ অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল। এছাড়াও গভর্নরের স্বৈরাচারী আচরণের প্রতিবাদে আজ বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের অংশগ্রহনে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। দাবি না মানলে আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে কলম বিরতির হুশিয়ারী দিয়েছেন তারা। 

কাউন্সিলের নেতারা বলেছেন, সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের কতিপয় সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, নিয়মনীতি ও নৈতিকতাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এর ফলে প্রাতিষ্ঠানিক সম্মান ও সুনামহানির প্রশ্ন ওঠায় কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে কাউন্সিলের পক্ষ থেকে গভর্নরের কতিপয় অনিয়মের বিষয়ে উচ্চপর্যায়ে তদন্ত কমিটি গঠন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।


বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে গভর্নর বরাবর দেওয়া চিঠিতে তারা এই দাবি জানান। চিঠির অনুলিপি পর্ষদের সব সদস্যদের কাছে পাঠানো হচ্ছে বলেও জানান কাউন্সিলের নেতারা।

কাউন্সিলের সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ স্বাক্ষরিত চিঠিতে তারা অভিযোগ করেন, গভর্নর সচিবালয় থেকে বিএফআইইউকে প্রদত্ত দাপ্তরিক নোটের মাধ্যমে নিয়মিত বিরতিতে ফ্রিজকৃত হিসাবের তথ্য প্রদানের নির্দেশনা দিয়েছেন। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, এ রকম স্পর্শকাতর তথ্য গভর্নর অফিসে বা গভর্নরের একান্ত সচিবের কাছে সংরক্ষণের সুযোগ নেই।


বিএফআইইউ থেকে প্রাপ্ত এই অত্যন্ত গোপনীয় তথ্য গভর্নরের স্ত্রী এবং গভর্নরের একান্ত সচিবের যোগসাজশে একটি সিন্ডিকেটের কাছে পাচার করা হচ্ছে মর্মে অভিযোগ রয়েছে। এই সিন্ডিকেটটি বিভিন্ন বন্ধ থাকা অ্যাকাউন্ট সচল করার বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ‘তদ্বির বাণিজ্য’ শুরু করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিএফআইইউ-এর অপারেশনাল স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থে তথ্যের এই অপব্যবহার মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।

এদিকে সাবেক গভর্নরের ব্যবহারের জন্য অতি সম্প্রতি কেনা একটি সচল গাড়ি থাকা সত্ত্বেও সরকারি ‘৮ বছরের ক্রয়সীমা’ ও ‘ব্যয় সংকোচন নীতি’ পদদলিত করে একটি নতুন বিলাসবহুল গাড়ি কেনা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, গভর্নরের স্ত্রী ও পরিবারের স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচলের সুবিধার্থে গভর্নর স্ত্রীর পছন্দ অনুযায়ী ২ কোটি টাকারও অধিক মূল্যের বিলাসবহুল মাল্টি পারপাস ভেহিক্যাল গাড়িটি কেনার জন্য চাপ প্রয়োগ করেছেন। সরকারি প্রতিষ্ঠান প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজকে উপেক্ষা করে এবং যথাযথ দরপত্র প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করে কেনা এই গাড়িটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্ট্যান্ডার্ড যানবাহনের তালিকার অন্তর্ভুক্ত নয়। এই ব্যক্তিগত পছন্দের কারণে রাষ্ট্রের কয়েক কোটি টাকা অপচয় হয়েছে এবং এটি পরবর্তী গভর্নরের ব্যবহারের উপযোগী নাও হতে পারে, যা সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত।

চিঠিতে তারা অভিযোগ করে বলেন, চুক্তি অনুযায়ী গভর্নর নিজের জন্য একটি এবং পরিবারের জন্য একটি; সর্বমোট দুটি গাড়ি ব্যবহারের অধিকারী। অথচ গভর্নর পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে বিধিবহির্ভূতভাবে ব্যাংকের ৪টি পৃথক গাড়ি সার্বক্ষণিকভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। নির্ধারিত জ্বালানি সীমা এবং রক্ষণাবেক্ষণ বাজেটের কয়েক গুণ অতিরিক্ত অর্থ এই ৪টি গাড়ির পেছনে ব্যয় করা হচ্ছে, যা সরাসরি জনগণের অর্থ অপব্যবহারের এবং গভর্নর পদের নৈতিক স্খলন।

গভর্নরের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে কর্মরত অতিরিক্ত পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তা অফিসের সার্বক্ষণিক গাড়ি ব্যবহার করা সত্ত্বেও নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা ‘গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা’ উত্তোলন করছেন। গভর্নরের সরাসরি তত্ত্বাবধানে থেকে এই ধরনের প্রকাশ্য আর্থিক অনিয়মে গভর্নরের মৌন সম্মতি ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে কর্মকর্তারা মনে করেন। উচ্চপদে আসীন একজন কর্মকর্তার এমন কর্মকাণ্ড ব্যাংকের প্রশাসনিক শৃঙ্খলার ওপর চরম আঘাত বলেও তারা মনে করেন।

ব্র্যাক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবে গভর্নরের পুরোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক রক্ষার হীন উদ্দেশ্যে ‘বিকাশ’ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দিতে গভর্নর নজিরবিহীন তাড়াহুড়ো করেছেন বলেও তারা অভিযোগ করেন। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, একক গোষ্ঠীর কাছে ১০ শতাংশের অধিক মালিকানা থাকার ক্ষেত্রে যে কঠোর আইনি বিধিনিষেধ রয়েছে, তা গভর্নর তোয়াক্কা করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। গত বোর্ড মিটিংয়ে কর্মকর্তাদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে গভর্নরের এই ব্যক্তিগত এজেন্ডাটি বাধাগ্রস্ত হলেও এর মাধ্যমে গভর্নরের ‘স্বার্থের সংঘাত’ জনসমক্ষে নগ্নভাবে ফুটে উঠেছে বলে কর্মকর্তারা মনে করেন।

শুধু তা-ই নয়, ব্যাংকের মেডিকেল সেন্টারে প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত থাকা সত্ত্বেও গভর্নর নিজে নিয়মিতভাবে বিশেষ কিছু ওষুধের ক্ষেত্রে ‘নো-স্টক’ স্লিপ গ্রহণ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই ওষুধগুলো গভর্নর প্রকৃত অর্থে ব্যবহার করেন না, বরং বাইরে থেকে কেনার নামে বানোয়াট বিল তৈরি করে অর্থ উত্তোলন করা হচ্ছে, যা আর্থিক অনিয়ম। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বোচ্চ পদে আসীন একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই ধরনের অনিয়ম সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকে ধুলায় মিশিয়ে দিচ্ছেন বলে কর্মকর্তারা মনে করেন।

এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর ফান্ড থেকে ইতোপূর্বে বিভিন্ন বেসরকারি, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুদান দেওয়ার চর্চা থাকলেও সরকারি বিদ্যালয়ে কোনো ধরনের অনুদানের নজির নেই। শুধু গভর্নরের শৈশবের বিদ্যাপীঠ বিবেচনায় সরকারি এ প্রতিষ্ঠানকে সিএসআর ফান্ড থেকে অনুদানে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে বাধ্য করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে চুয়াডাঙ্গায় অবস্থিত গভর্নরের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর উদ্যোগে তৈরি এ প্রতিষ্ঠানটিতে ক্যানসার ও কিডনি আক্রান্ত রোগীদের সহায়তা করার জন্য এর সক্ষমতা বিবেচনার সুযোগ যাচাই-বাছাইয়ে পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে তড়িঘড়ি করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর ফান্ড থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা দিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে বাধ্য করা হয় মর্মে অভিযোগ রয়েছে।

টাঙ্গাইলের করটিয়ায় গর্ভনরের মালিকানাধীন বাগান বাড়ির সন্নিহিত বিদ্যালয়টির পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হিসেবে নিজ দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর ফান্ড থেকে বিদ্যালয়টিতে অনুদান দেওয়া হয়েছে, যা সরাসরি স্বার্থের সংঘাত মর্মে অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কাউন্সিলের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা এবং সুশাসন অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে উপরোক্ত প্রতিটি অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সমন্বয়ে একটি ‘উচ্চপর্যায়ের শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি’ গঠন করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করায় ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের তিন কর্মকর্তাকে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ থেকে এক আদেশে তাদের বদলি করা হয়। এর এক দিন আগে তাদের ১০ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। বদলীকৃত কর্মকর্তারা হলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নীল দলের সাধারণ সম্পাদক ও এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, নীল দল থেকে নির্বাচিত বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ এবং একই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ।

আদেশ অনুযায়ী, পরিচালক নওশাদ মোস্তফাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে বরিশাল অফিসে বদলি করা হয়েছে। এ ছাড়া মাসুম বিল্লাহকে রংপুর এবং গোলাম মোস্তফা শ্রাবণকে বগুড়া অফিসে পাঠানো হয়েছে।