ঢাকা || ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

নগদ নিয়ে মিথ্যাচার করছেন গভর্নর

নগদ নিয়ে মিথ্যাচার করছেন গভর্নর

ব্যাংক ইনফো

প্রকাশিত: ১২:২৩, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ‘নগদ’ বেসরকারি খাতে ছাড়ার বিষয়ে ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম ওরফে আরমানের চিঠি প্রাপ্তি নিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন গভর্নর। গত সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) একটি জাতীয় দৈনিককে তিনি বলেছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যারিস্টার আরমানের কোনো চিঠি তিনি পাননি। যদিও চিঠির সত্যতা স্বীকার করেছেন ব্যারিস্টার আরমান। শুধু তা-ই নয়, গভর্নরের এমন বক্তব্যের এক দিন পরেই বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ব্যারিস্টার আরমান।

এর আগে গত ৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে একটি চিঠি দেন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা মীর কাশেম আলীর ছেলে ও সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচিত এমপি ব্যারিস্টার আরমান। চিঠিতে তিনি নগদ কেনার আগ্রহ প্রকাশ করে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, তার এই আগ্রহের বিষয়ে এর আগেও গভর্নরের সঙ্গে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। গভর্নরের দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পরিপ্রেক্ষিতে নগদ ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসসংক্রান্ত গঠনমূলক পরামর্শের জন্য কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন তিনি। 

সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে গভর্নরকে দেওয়া এক চিঠিতে ব্যারিস্টার আরমান আরও বলেন, বাংলাদেশের ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স গ্রহণ ও প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গভর্নরের সহযোগিতা কামনাই ছিল বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য। উদীয়মান প্রযুক্তি, ডিজিটাল উদ্ভাবন ও প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে বৈশ্বিক আর্থিক খাতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্নের কথাও তিনি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে জানান, এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে কয়েকজন বিদেশি বিনিয়োগকারীও তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।

আরমান তার চিঠিতে আরও লেখেন, গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে তিনি জানতে পারেন যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার কিছু অনিয়মের কারণে বর্তমানে নগদ বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি প্রশাসনের অধীনে রয়েছে এবং যথাযথ ডিউ ডিলিজেন্সের পর এটি নতুন মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।

চিঠিতে নগদ অধিগ্রহণকে একটি ‘সম্মানজনক ও সম্ভাবনাময় সুযোগ’ হিসেবে উল্লেখ করে বিনিয়োগের আগে একটি পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিট পরিচালনার অনুমতি চান তিনি। অডিটের মাধ্যমে নগদের আর্থিক, কার্যক্রমগত ও ব্যবসায়িক অবস্থার প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটনের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়। 

এদিকে গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্যারিস্টার আরমান বলেন, আর্থিক অনিয়ম ও মালিকানা নিয়ে বিতর্কে থাকা ‘নগদ’কে বেসরকারি খাতে ছাড়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে নতুন সরকারের নীতির ওপর। সরকার ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিলে তবেই বিনিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে। 

তিনি বলেন, গভর্নর জানিয়েছেন, নতুন সরকার আসার পর ‘নগদ’ নিয়ে তাদের চূড়ান্ত নীতি এখনো নির্ধারিত হয়নি। যদি সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের মতো এটি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে পরবর্তী বিনিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই নগদে বিদেশি বিনিয়োগ আনার বিষয়ে আলোচনা চলছিল। সেই ধারাবাহিকতায় গভর্নরের সঙ্গে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

নিজের ভূমিকা সম্পর্কে আরমান জানান, তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে নন, একজন পেশাদার আইনজীবী হিসেবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন।

তিনি বলেন, ‘আমি একজন পেশাদার আইনজীবী। এর আগে ডেল, মাইক্রোসফট, অ্যাপল ও উবারের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এখন সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের পক্ষে আইনি সহায়তা দিচ্ছি।’ সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের ডিজিটাল ব্যাংকিং খাতে আগ্রহী বলেও জানান আরমান। তার ভাষ্য, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই তারা বিনিয়োগের ক্ষেত্র খুঁজছিলেন। সরকারের সঙ্গে আলোচনায় আমরা তাদের আগ্রহের বিষয়টি জানিয়েছি।’

নগদে বিনিয়োগ লাভজনক হবে কি না, তা যাচাই করতে অডিট করার আগ্রহের কথাও গভর্নরকে জানানো হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সংসদ সদস্য হওয়ার পর এমন প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করা স্বার্থের সংঘাত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আরমান বলেন, ‘সংসদ সদস্য হিসেবে এই দায়িত্ব পালন কোনো স্বার্থের সংঘাত তৈরি করবে না। রাজনীতি করছি জনগণের সেবার জন্য, এখানে কোনো আয় নেই। পরিবার চালানোর জন্য পেশা হিসেবে আইন চর্চা করি। এতে কোনো দ্বন্দ্ব নেই।’

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে আন্তরিক। এর আগে গত বছরের ২৫ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জানান, নগদকে ডাক অধিদপ্তরের হাত থেকে বেসরকারি খাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তখন তিনি বলেছিলেন, তিন থেকে চার মাসের মধ্যে নতুন বিনিয়োগকারীর কাছে মালিকানা হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে, কারণ পোস্ট অফিসের পক্ষে নগদ পরিচালনা করা সম্ভব নয়।

২০১৯ সালের ২৬ মার্চ মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করে ‘নগদ’। পরে প্রতিষ্ঠানটিকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সও দেওয়া হয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নগদকে নিয়ম ভেঙে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক নগদের আগের পর্ষদ ভেঙে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। তবে উচ্চ আদালত পরে সেই সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করলে ডাক অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব নেয়।

গত আগস্টে এক অনুষ্ঠানে নগদ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন গভর্নর। সেখানে তিনি বলেছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে পরামর্শ করেই নগদকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে সফলভাবে সেটা করা সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেছিলেন, নগদ পরিচালনার মতো সক্ষমতা পোস্ট অফিসের নেই। এখানে একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে প্রধান শেয়ারহোল্ডার হিসেবে যুক্ত করতে হবে।