বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের জরুরি বৈঠকে ‘ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স’ আটকে যাওয়ার পর গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এবার আদালতের স্থগিতাদেশের মধ্যেই বেসরকারি খাতের লাভজনক মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান নগদকে বিক্রি করে দেওয়ার পাঁয়তারা চালাচ্ছেন। গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই নগদের নানা অনিয়ম তুলে ধরে প্রশাসক নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের পরামর্শের ভিত্তিতে গত আগস্টে নগদকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন গভর্নর।
গত ৩১ আগস্ট নগদের জন্য কৌশলগত অংশীদার খুঁজতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দেয়। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য একটি আর্থিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের উদ্যোগ নেয় বিডা ও বাংলাদেশ ব্যাংক। ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিডা কার্যালয়ে এ-সংক্রান্ত আবেদন জমা দিতে বলা হয়। সেই বিজ্ঞপ্তির পর ডেলোইটি, কেপিএমজি, পিডব্লিউসিসহ মোট ১০টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে। এর মধ্য থেকে কেপিএমজিকে দিয়ে নগদে ফরেনসিক অডিট করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা মীর কাশেম আলীর ছেলে ও ঢাকা-১৪ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম ওরফে আরমানের সঙ্গে নগদ বিক্রির বিষয়ে একাধিক বৈঠক করেছেন গভর্নর। এসব বৈঠকের ধারাবাহিকতায় গত ৮ ফেব্রুয়ারি নগদ কেনার আগ্রহ প্রকাশ করে গভর্নরের কাছে একটি চিঠি পাঠান ব্যারিস্টার আরমান। চিঠিতে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে তার এই আগ্রহের বিষয়ে এর আগেও গভর্নরের সঙ্গে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। গভর্নরের দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পরিপ্রেক্ষিতে নগদ ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস-সংক্রান্ত গঠনমূলক পরামর্শের জন্য কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন।
চিঠিতে ব্যারিস্টার আরমান বলেন, বাংলাদেশের ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স গ্রহণ ও প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গভর্নরের সহযোগিতা কামনাই ছিল বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য। উদীয়মান প্রযুক্তি, ডিজিটাল উদ্ভাবন ও প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে বৈশ্বিক আর্থিক খাতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্নের কথাও তিনি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে জানান, এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে কয়েকজন বিদেশি বিনিয়োগকারীও তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।
আরমান তার চিঠিতে আরও লেখেন, গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকে তিনি জানতে পারেন যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার কিছু অনিয়মের কারণে বর্তমানে নগদ বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি প্রশাসনের অধীনে রয়েছে এবং যথাযথ ডিউ ডিলিজেন্সের পর এটি নতুন মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
চিঠিতে নগদ অধিগ্রহণকে একটি ‘সম্মানজনক ও সম্ভাবনাময় সুযোগ’ হিসেবে উল্লেখ করে বিনিয়োগের আগে একটি পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিট পরিচালনার অনুমতি চান তিনি। অডিটের মাধ্যমে নগদের আর্থিক, কার্যক্রমগত ও ব্যবসায়িক অবস্থার প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটনের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ কেপিএমজিকে দিয়ে করানো অডিটের পরও তিনি আলাদাভাবে অডিট করাতে চেয়েছেন।
গত আগস্টে এক অনুষ্ঠানে নগদকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন গভর্নর। সেখানে তিনি বলেছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে পরামর্শ করেই নগদকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে সফলভাবে সেটা করা সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেছিলেন, নগদ পরিচালনার মতো সক্ষমতা ডাক বিভাগের নেই। এখানে একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে প্রধান শেয়ারহোল্ডার হিসেবে যুক্ত করতে হবে।
গভর্নরের এমন উদ্যোগের পর নগদ বিক্রির বিষয়ে স্থগিতাদেশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। গত ১১ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার জজ আদালতের বিচারপতি মো. রেজাউল হক এ-সংক্রান্ত রায় দেন। রায়ে বলা হয়েছে, নগদে প্রশাসক নিয়োগের বৈধতা মামলার শুনানি না হওয়া পর্যন্ত এ সম্পর্কিত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সরকারের হাতে নেই।
কিন্তু এর পরও নগদ বিক্রির উদ্যোগ থেমে নেই বলে জানা গেছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘এই ধরনের চিঠির কথা আমি এখনো শুনিনি। তবে কেউ যদি এখানে বিনিয়োগ করতে চায়, তাকে আগে অনেক আইনগত বিষয়ে পরিষ্কার হতে হবে। বিশেষ করে নগদের প্রকৃত মালিকানা কার হাতে, সেটা সবার আগে নিশ্চিত হতে হবে। এখানেই একটা বড় জটিলতা আছে। ডাক বিভাগ সেবাটি প্রদান করলেও ‘নগদ লিমিটেড’ নামক যে প্রতিষ্ঠানে এটি দান করা হয়েছে, সেটির মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আগের যারা মালিক ছিলেন, তারা তো এখন আর আগের অবস্থায় নেই। ফলে মালিকানা হস্তান্তর করতে হলে যিনি আইনগতভাবে মালিক, তার মাধ্যমেই তা হতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এখানে কেবল মিডিয়া বা নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করতে পারে, বাংলাদেশ ব্যাংক এই প্রতিষ্ঠানের মালিক নয় যে চাইলেই কারও হাতে এটি তুলে দিতে পারবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আগের মালিকের সঙ্গে বিষয়টির ফয়সালা না হলে ভবিষ্যতে এটি আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে এবং বিনিয়োগ ভেস্তে যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে আগে সরকারকে ওই শেয়ারগুলো বাজেয়াপ্ত করতে হবে। সরকার যদি আগে শেয়ারগুলো আইনগতভাবে বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ নেয়, তবেই সেগুলো হস্তান্তরের নতুন প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হতে পারে। সেই লক্ষ্যেও কাজ করছেন গভর্নর।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের কাছে এমন কোনো নির্দেশনা নেই। গভর্নর স্যারের কাছ থেকে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট মেসেজ বা উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ আমরা পাইনি।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগদের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘নগদ বিক্রির সিদ্ধান্ত গভর্নর এককভাবে নিতে পারেন না। প্রথমত, আদালতে বিচারাধীন কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা গভর্নরের নেই। দ্বিতীয়ত, নগদের মালিকানাসংক্রান্ত জটিলতা। নগদের মালিকানা হিসেবে তিনটি পার্টি রয়েছে। নগদের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডাক বিভাগ এবং রেগুলেটর হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই তিন পার্টি একত্রে সম্মতি না দিলে নগদের এই সমস্যার সমাধান কোনোদিন হবে না।’













