বেসরকারি খাতের কর্মীদের অবসর-পরবর্তী আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার ‘প্রগতি স্কিম’-এর আওতায় আনার উদ্যোগ জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছে সরকার।
বুধবার বাংলাদেশ সচিবালয়ের অর্থ ভবনে অনুষ্ঠিত এক পর্যালোচনা সভায় ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) প্রতি এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি এবং দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা অংশ নেন। সভায় সচিব ব্যাংকগুলোর এমডিদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রগতি স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান। তিনি বলেন, দেশে বেসরকারি খাতে কর্মরত প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ নিবন্ধিত শ্রমিক ও কর্মচারীর বড় একটি অংশ এখনো অবসর-পরবর্তী কোনো আর্থিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় নেই। সরকারি চাকরিজীবীরা পেনশন সুবিধা পেলেও বেসরকারি খাতে দীর্ঘদিন ধরে এমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
তিনি আরও বলেন, ২০২৩ সালে চালু হওয়া সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আওতাধীন ‘প্রগতি স্কিম’ বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য একটি কার্যকর ও টেকসই অবসর সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে।
সভায় প্রগতি স্কিমকে আরও আকর্ষণীয় করতে শরিয়াহভিত্তিক পেনশন স্কিম চালু, নমিনিদের জন্য আজীবন পেনশন সুবিধা বিবেচনা এবং আউটসোর্সিং কর্মীদের অন্তর্ভুক্তির মতো প্রস্তাবও তুলে ধরা হয়।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের উপস্থাপনায় জানানো হয়, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার-২০২৬ অনুযায়ী বেসরকারি খাতে কর্মরত ব্যক্তিদের বার্ধক্যকালীন আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি পেনশন ফান্ড গঠনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সর্বজনীন পেনশন স্কিম সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান উদ্যোগ।
প্রগতি স্কিমটি বিশেষভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও কর্মীদের জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান এই স্কিমে যুক্ত হলে মাসিক চাঁদার ৫০ শতাংশ কর্মী এবং বাকি ৫০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বহন করবে। স্কিমে মাসিক চাঁদার পরিমাণ ১ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্কিমের আওতায় অবসরের পর গ্রাহক আজীবন মাসিক পেনশন পাবেন। পাশাপাশি চাঁদার ওপর আয়কর রেয়াত এবং প্রাপ্ত পেনশন আয়করমুক্ত থাকবে। গ্রাহকের বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হলে সঞ্চিত তহবিলের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ এককালীন গ্র্যাচুইটি হিসেবে উত্তোলনের সুযোগ থাকবে। পুরো বিনিয়োগ রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির আওতায় থাকবে বলেও জানানো হয়।
সভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ মে পর্যন্ত সর্বজনীন পেনশনের চারটি স্কিম—প্রগতি, সুরক্ষা, সমতা ও প্রবাসীতে মোট ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৯৩০ জন নিবন্ধিত হয়েছেন। এসব স্কিমে মোট জমার পরিমাণ প্রায় ২৬০ কোটি টাকা এবং মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮৬ কোটি টাকা।
এ ছাড়া জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ৪৮টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে। এর মধ্যে ২৪টি ব্যাংক সক্রিয়ভাবে চাঁদা গ্রহণ ও প্রদান কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রায় ৪ কোটি পরিবারের প্রতিটি থেকে অন্তত একজন সদস্যকে সর্বজনীন পেনশনের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনে ব্যাংকগুলোকে প্রতিটি শাখায় সর্বজনীন পেনশন স্কিমের জন্য পৃথক ডেস্ক স্থাপন, প্রচারণামূলক ব্যানার প্রদর্শন এবং নিজস্ব বিপণন কার্যক্রমে পেনশন স্কিমকে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে সব বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাধ্যতামূলকভাবে প্রগতি স্কিমে যুক্ত করার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সহকারী মহাব্যবস্থাপক আয়েশা হকের সঞ্চালনায় সভায় অর্থ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।












