ঢাকা || ১৫ জুলাই ২০২৬

বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক হলেও প্রসার ধীর

বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক হলেও প্রসার ধীর

ব্যাংক ইনফো

প্রকাশিত: ০৮:৫৩, ১৫ জুলাই ২০২৬

ডিজিটাল লেনদেন আরও সহজ ও আন্তঃসংযুক্ত করতে দেশের সব ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে এখন একটি মাত্র কিউআর কোড ব্যবহার করেই যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএসের গ্রাহক পণ্য ও সেবার মূল্য পরিশোধ করতে পারছেন। অর্থাৎ বিকাশ বা রকেটের বাংলা কিউআর কোডেও সোনালী ব্যাংক কিংবা অন্য যেকোনো ব্যাংকের অ্যাপ থেকে অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলা কিউআরের মাধ্যমে প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৩৭ হাজার লেনদেন হচ্ছে, যার আর্থিক পরিমাণ ১১ থেকে ১২ কোটি টাকা। তবে ব্যাংক ও এমএফএসের মাধ্যমে প্রতিদিন মোট ডিজিটাল কেনাকাটা ও পেমেন্টের পরিমাণ ৩৪০ কোটি টাকার বেশি হওয়ায় এখনো ডিজিটাল লেনদেনের বড় অংশ বাংলা কিউআরের আওতায় আসেনি।

প্রসারে বড় বাধা মাশুল ও হিসাব খোলার জটিলতা

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলা কিউআরের বিস্তার বাড়াতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো খুচরা বিক্রেতাদের সহজে এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা। কিন্তু এখনো ব্যক্তিগত রিটেইল হিসাব খোলার প্রক্রিয়া পুরোপুরি ডিজিটাল না হওয়ায় অনেক ছোট ব্যবসায়ী প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অভাবে হিসাব খুলতে পারছেন না।

এর পাশাপাশি বাংলা কিউআরের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণে ছোট-বড় সব বিক্রেতাকেই ১ শতাংশ মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) বা মাশুল দিতে হচ্ছে। আগে অনেক খাত—যেমন ছোট মুদিদোকান, পরিবেশক, জ্বালানি সরবরাহকারী ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—এই মাশুল থেকে অব্যাহতি পেত।

সংশ্লিষ্টদের মতে, খাতভিত্তিক মাশুল নির্ধারণ, শুরুর দিকে মাশুল মওকুফ, সরকারি প্রণোদনা, দ্রুত লেনদেন নিষ্পত্তি এবং বিরোধ দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা করা গেলে বাংলা কিউআরের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোরও আগ্রহ কম

ব্যাংকারদের ভাষ্য, একজন খুচরা বিক্রেতাকে বাংলা কিউআর ব্যবস্থায় যুক্ত করতে গড়ে প্রায় ৫০০ টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু এ ব্যয়ের বিপরীতে কোনো প্রণোদনা না থাকায় ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোরও নতুন কিউআর স্থাপনে আগ্রহ কম।

সরকারি প্রণোদনার পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, গ্রাহকদের জন্য লেনদেনকে সহজ করতে বাংলা কিউআর চালু করা হয়েছে। তবে সেবাটির দ্রুত বিস্তারে শুরুতে ভর্তুকি ও প্রণোদনা থাকলে ভালো হতো। বিষয়টি সরকারের কাছে তুলে ধরা হবে বলে জানান তিনি।

শুরুতে প্রযুক্তিগত কিছু সমস্যা

গত জুন পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠান নিজস্ব কিউআর কোড ব্যবহার করলেও ১ জুলাই থেকে বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক করা হয়। এরপর সব প্রতিষ্ঠানকে তাদের অ্যাপ হালনাগাদ করতে হয়েছে।

তবে এখনো অনেক গ্রাহক অ্যাপ আপডেট না করায় এবং কোথাও কোথাও নেটওয়ার্ক, কিউআর কোড বা হিসাবসংক্রান্ত ত্রুটির কারণে লেনদেনে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, এসব সমস্যা ধীরে ধীরে দূর হবে। কারণ, সব লেনদেন ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ (এনপিএসবি)-এর মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়ায় নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি নেই।

লেনদেনে ইতিবাচক অগ্রগতি

বাংলা কিউআর প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয় ১৮ জানুয়ারি ২০২৩। পরে ১ নভেম্বর ২০২৫ থেকে ব্যাংক, পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি), পেমেন্ট সার্ভিস অপারেটর (পিএসও) এবং এমএফএস প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আন্তঃলেনদেন চালু হয়। আর চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে এটি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী—

৩–৫ জুলাই: ১ লাখ ১০৬টি লেনদেন, মোট প্রায় ৩১ কোটি টাকা।
৬–৯ জুলাই: দৈনিক গড় লেনদেন ১২ কোটি টাকা।
ফেব্রুয়ারি: দৈনিক গড় ৭ কোটি টাকা।
মার্চ: দৈনিক গড় সাড়ে ৬ কোটি টাকা।

অর্থাৎ বাধ্যতামূলক করার পর বাংলা কিউআরের ব্যবহার ও লেনদেনের পরিমাণ বাড়তে শুরু করেছে।

দেশে প্রায় ১৭ লাখ কিউআর কোড

ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১৭ লাখ কিউআর কোড রয়েছে। এর মধ্যে—

বিকাশ: ৫ লাখ
ডাচ্-বাংলা ব্যাংক (রকেটসহ): ২ লাখ ৭০ হাজার
পূবালী ব্যাংক: ১ লাখ ৯০ হাজার
ইসলামী ব্যাংক: ৮০ হাজার
সোনালী ব্যাংক: ৫৪ হাজার
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক: ৫০ হাজার
সিটি ব্যাংক: ৩৮ হাজার

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, দুর্নীতি কমাতে এবং আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা আনতে ডিজিটাল পেমেন্টের বিকল্প নেই। এতে গ্রাহক ও ব্যবসায়ী উভয়েই সুবিধা পাবেন, একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আদায়ও বাড়বে। তিনি বলেন, বাংলা কিউআরের প্রসারে অন্যান্য দেশের সফল অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে, যাতে সেবাটির সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত না হয়।