চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনাল প্রকল্পে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত একটি টার্মিনাল চালু করতে ব্রেকওয়াটারের নকশা চূড়ান্ত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে সরকার। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ব্রেকওয়াটার নির্মাণ ও প্রকল্প এলাকার প্রস্তুতিমূলক কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত টার্মিনাল নির্মাণ শুরু করা সম্ভব হবে না।
বর্তমানে ব্রেকওয়াটারের নকশার কারিগরি মূল্যায়ন চলছে। নকশা চূড়ান্ত করতে দুটি বিশেষায়িত সিমুলেশন প্রয়োজন। এর মধ্যে প্রথম ধাপের সিমুলেশন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সময় কমাতে দ্বিতীয় ধাপের সিমুলেশন দক্ষিণ আফ্রিকার পরিবর্তে সিঙ্গাপুরে সম্পন্ন করার সম্ভাবনা যাচাই করছে সরকার।
এ বিষয়ে নৌপরিবহন সচিব মো. জাকারিয়া বলেন, বে টার্মিনাল প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে ব্রেকওয়াটার নির্মাণ।
তিনি বলেন, প্রথমে ব্রেকওয়াটার নির্মাণ করতে হবে। ড্রেজিং ও ভূমি অধিগ্রহণ নিয়মিত প্রক্রিয়া হলেও সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ হলো দুটি সিমুলেশনের মাধ্যমে ব্রেকওয়াটারের নকশা চূড়ান্ত করা।
সম্প্রতি সরকারের একটি প্রতিনিধি দল সিঙ্গাপুরের পিএসএ ইন্টারন্যাশনাল পরিদর্শন করে এবং সেখানে ব্রেকওয়াটারের কারিগরি মূল্যায়নের জন্য দ্বিমাত্রিক (২ডি) সিমুলেশন সফলভাবে সম্পন্ন করে।
জাকারিয়া বলেন, পরবর্তী ধাপটি দক্ষিণ আফ্রিকায় হওয়ার কথা ছিল। তবে সময় কমানোর লক্ষ্যে সেটি সিঙ্গাপুরেই করা যায় কি না, তা আমরা যাচাই করছি।
তিনি জানান, ব্রেকওয়াটারের পাশাপাশি ভূমি অধিগ্রহণের কাজও সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলছে।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় কনটেইনার টার্মিনাল-১ ও কনটেইনার টার্মিনাল-২ নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে সিঙ্গাপুরের পিএসএ ইন্টারন্যাশনাল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে তাদের আলোচনা চলছে।
প্রকল্পের মূল সামুদ্রিক অবকাঠামো—ব্রেকওয়াটার নির্মাণ ও নৌপথ ড্রেজিং—বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে। অন্যদিকে টার্মিনাল স্থাপনা নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব নেবে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা।
সরকার বে টার্মিনাল কমপ্লেক্সের আওতায় একটি বহুমুখী টার্মিনাল এবং একটি এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন টার্মিনাল নির্মাণের বিষয়ও বিবেচনা করছে। তবে এলএনজি টার্মিনাল বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
মো. জাকারিয়া বলেন, ব্রেকওয়াটারই পুরো প্রকল্পের ভিত্তি। এটি নির্মাণ শেষ হলে টার্মিনাল অপারেটররা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী অবকাঠামোর নকশা ও উন্নয়নকাজ শুরু করতে পারবেন।
বৃহৎ সমুদ্রগামী জাহাজ চলাচলের উপযোগী করে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে নেওয়া বে টার্মিনাল প্রকল্পে দুটি কনটেইনার টার্মিনাল এবং একটি বহুমুখী টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে।
বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। পরিকল্পিত বে টার্মিনাল চালু হলে আমদানি-রপ্তানি ব্যয় কমবে এবং দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
তিনি বলেন, বে টার্মিনাল চালু হলে বড় আকারের মাদার ভেসেল সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়তে পারবে। বর্তমানে নাব্যতার সীমাবদ্ধতার কারণে এসব জাহাজ বন্দরে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে সরাসরি জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হলে ট্রান্সশিপমেন্ট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
এ ছাড়া প্রকল্পটি আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ত্বরান্বিত করবে, বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়তা করবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ব্রেকওয়াটারের নকশা চূড়ান্ত হওয়া সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে তারা প্রকল্পের কারিগরি বিষয় মূল্যায়ন করে কনসেশন চুক্তির দিকে অগ্রসর হতে পারবেন।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, চলতি অর্থবছরের জুনের মধ্যে টার্মিনাল নির্মাণকাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে এবং ২০৩০ সালে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি জানান, ২০২৬ সালের মে মাসে ২ডি সিমুলেশন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আগামী আগস্ট বা সেপ্টেম্বরের মধ্যে ত্রিমাত্রিক (৩ডি) সিমুলেশন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) বে টার্মিনাল মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প এবং ব্রেকওয়াটার নির্মাণ ও চ্যানেল ড্রেজিং-সংবলিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদন দেয়।
এরই মধ্যে ব্রেকওয়াটার নির্মাণ, চ্যানেল ড্রেজিং এবং নৌ-নির্দেশনা সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য সম্ভাব্য ঠিকাদারদের নিয়ে ‘জেনারেল মার্কেট এনগেজমেন্ট’ সম্মেলন আয়োজন করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
২০২৫ সালে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ৬৫ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি সই হওয়ার পর সংস্থাটির ইনভেস্টমেন্ট প্রজেক্ট ফাইন্যান্সিং (আইপিএফ) নীতিমালা অনুযায়ী শিগগিরই ক্রয় কার্যক্রম শুরু হবে।
৬৫ কোটি ডলারের বিশ্বব্যাংক অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্প দেশের বন্দর সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে, জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড সময় কমাবে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা জোরদার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ৫০০ মিটার দীর্ঘ একটি বহুমুখী টার্মিনাল, ১ হাজার ২২৫ মিটার দীর্ঘ একটি কনটেইনার টার্মিনাল এবং ৮৩০ মিটার দীর্ঘ আরেকটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মিত হবে। মোট ৩ হাজার ৫০০ মিটার জেটিতে একসঙ্গে চার থেকে পাঁচটি বড় জাহাজ ভিড়তে পারবে।
এ ছাড়া ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ জলবায়ু সহনশীল ব্রেকওয়াটার বন্দরকে উত্তাল ঢেউ ও বৈরী আবহাওয়া থেকে সুরক্ষা দেবে। একই সঙ্গে নৌপথ ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে পানাম্যাক্সসহ বড় জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা হবে।
কর্মকর্তাদের হিসাবে, জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড সময় কমে গেলে দেশের অর্থনীতিতে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ মার্কিন ডলার সাশ্রয় হবে।
পতেঙ্গা উপকূলসংলগ্ন প্রায় ৯০০ একর জমিতে গড়ে ওঠা বে টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বর্তমান প্রায় ৩১ লাখ টিইইউ থেকে আরও ৫০ লাখ টিইইউ পর্যন্ত বাড়বে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, পরিবহন ব্যয় হ্রাস, সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক সংযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ২ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত অবদান রাখতে পারে।
বাংলাদেশে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের (অ্যামচেম) সাবেক সভাপতি এবং এক্সপেডিটরস (বাংলাদেশ)-এর কান্ট্রি ম্যানেজার ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেন, বে টার্মিনাল বাংলাদেশের জন্য গেম চেঞ্জার হতে পারে। এটি আঞ্চলিক সংযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে আমাদের সরবরাহ ও লজিস্টিকস ব্যবস্থার দক্ষতা উন্নত করতেই হবে।”**















