ঢাকা || ১৩ মার্চ ২০২৬

নাভানা ফার্মা দখলের চেষ্টা: তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন

নাভানা ফার্মা দখলের চেষ্টা: তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন

ব্যাংক ইনফো

প্রকাশিত: ১১:২৬, ১৩ মার্চ ২০২৬

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ওষুধ খাতের কোম্পানি নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস আবারও দখলের তৎপরতা শুরু করেছেন পদত্যাগ করা কয়েকজন প্রভাবশালী শেয়ারধারী—এমন অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে পলাতক থাকা এসব ব্যক্তিই দূর থেকেই কোম্পানিটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে।

কোম্পানিটির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের পক্ষ থেকে বিষয়টি জানিয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় ঘটনাটি তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করেছে কমিশন। পাশাপাশি তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুনর্গঠিত পরিচালনা পর্ষদ বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার কমিশনের সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং তদন্ত কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন বিএসইসির অতিরিক্ত পরিচালক শেখ মো. লুৎফুল কবির ও মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন এবং সহকারী পরিচালক মতিউর রহমান ও নিজাম উদ্দিন।

পলাতক সাবেক পরিচালকদের নাম উঠে এসেছে

অভিযোগ অনুযায়ী, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরী, তাঁর স্ত্রী ইমরানা জামান এবং তাঁদের সহযোগী আদনান ইমাম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা কোম্পানিটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এঁরা পলাতক রয়েছেন। ওই সময়ের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আনিসুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী ইমরানা জামান কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ থেকে পদত্যাগ করেন। একই বছরের নভেম্বরে পদত্যাগ করেন আদনান ইমামের বোন জাহার রসুল।

হাইব্রিড সভায় হঠাৎ যোগ

সূত্র জানায়, গত ২৮ জানুয়ারি নাভানা ফার্মার ৬৫তম পর্ষদ সভা হাইব্রিড পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন কোম্পানির পুনর্গঠিত পর্ষদের চেয়ারম্যান সাইকা মাজেদ।

একপর্যায়ে অনলাইনে সভায় যুক্ত হন পদত্যাগ করা সাবেক পরিচালক আনিসুজ্জামান চৌধুরী, ইমরানা জামান, আদনান ইমাম ও জাহার রসুল। তাঁদের সভায় যুক্ত করেন কোম্পানির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাঈদ আহমেদ।

জানা গেছে, আদনান ইমামের নামে সরাসরি কোনো শেয়ার না থাকলেও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে কোম্পানির উল্লেখযোগ্য শেয়ার রয়েছে।

‘ভুয়া’ সভার অভিযোগ

কোম্পানির চেয়ারম্যান সাইকা মাজেদ দাবি করেছেন, এর আগে অনুষ্ঠিত ৬৪তম পর্ষদ সভাটি ছিল ‘ভুয়া’। তাঁর অভিযোগ, চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি ওই সভার বিষয়ে কিছুই জানতেন না।

বিএসইসি ২০২৫ সালের এপ্রিলে সাইকা মাজেদকে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয় এবং পরে তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। গত বছরের জুন থেকে তিনি এ দায়িত্ব পালন করছেন।

২৮ জানুয়ারির সভায়ও তিনি সভাপতিত্ব করলেও হঠাৎ করে সাবেক পলাতক পরিচালকরা অনলাইনে যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ে এবং সভা দ্রুত শেষ করতে হয়। পরে এ বিষয়ে বিএসইসিতে অভিযোগ জানানো হয়।

কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টানাপোড়েন

চেয়ারম্যান সাইকা মাজেদের অভিযোগ, ভারপ্রাপ্ত এমডি সাঈদ আহমেদ পদত্যাগ করা কয়েকজন সাবেক পরিচালকের সঙ্গে যোগসাজশ করে কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

তিনি বলেন, ইতিমধ্যে কোম্পানি সচিবকে অফিস থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে এবং আইটি নিয়ন্ত্রণও তাঁদের হাতে চলে গেছে। এমনকি কোম্পানির ওয়েবসাইটে পরিচালনা পর্ষদের তালিকাও পরিবর্তন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

তাঁর ভাষ্য, “বর্তমানে তাঁরা কোম্পানিটি নিজেদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এতে সাধারণ শেয়ারধারীদের স্বার্থ হুমকির মুখে পড়েছে।”

এমডির ভিন্ন দাবি

তবে ভারপ্রাপ্ত এমডি সাঈদ আহমেদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের আগস্টের পর যেসব পরিচালক পদত্যাগ করেছেন, ব্যাংকের আপত্তির কারণে তাঁদের পদত্যাগ আইনগতভাবে নিষ্পত্তি হয়নি।

তিনি বলেন, “তাঁরা পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে কোম্পানির বিষয়ে নিজেদের বক্তব্য দিতে চাইলে নিয়ম মেনেই তাঁদের সভায় যুক্ত করা হয়েছে। ৬৪তম ও ৬৫তম সভা আইন মেনেই হয়েছে।”

আগের অনিয়মের অভিযোগ

বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, আনিসুজ্জামান চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী ইমরানা জামানের বিও হিসাব বেসরকারি United Commercial Bank-সংক্রান্ত অনিয়মের মামলায় স্থগিত রয়েছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে ব্যাংকটি সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তাঁর ভাই আনিসুজ্জামান ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের প্রভাবেই পরিচালিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় ব্যাংকে নানা আর্থিক অনিয়মের ঘটনাও সামনে আসে।

তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুরোনো বোর্ড বহাল

বিএসইসি জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোম্পানির ৬৪তম ও ৬৫তম পর্ষদ সভার কার্যকারিতা স্থগিত থাকবে। পাশাপাশি ৬৩তম সভায় যাঁরা পরিচালক ছিলেন, তাঁদের পুনর্বহাল করা হয়েছে।

বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেন, “কোম্পানিটি জোর করে দখলের চেষ্টা চলছে—এমন অভিযোগ পাওয়ায় আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

কোম্পানির পটভূমি

২০২০ সালে ইসলাম গ্রুপের কাছ থেকে নাভানা ফার্মা কিনে নেন আনিসুজ্জামান চৌধুরীসহ তাঁদের আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত কয়েকজন। ২০২২ সালে কোম্পানিটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে আইপিওর মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে কোম্পানিটি।

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, নাভানা ফার্মার প্রায় ২৮ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে।