গত এক মাসে এশিয়ার টেলিযোগাযোগ বাজারে টেলিনরকে ঘিরে দুটি বড় সিদ্ধান্ত নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নরওয়ের টেলিকম জায়ান্ট টেলিনর পাকিস্তানে তাদের কার্যক্রমের বিক্রি চূড়ান্ত করেছে—এশিয়া থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়ার প্রায় দুই বছর পর। একই সঙ্গে থাইল্যান্ডে নিজেদের অংশীদারিত্ব বিক্রির চুক্তিতেও পৌঁছেছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব পদক্ষেপের ফলে এশিয়ায় টেলিনরের উপস্থিতি আরও সীমিত হয়ে পড়েছে।
ধারাবাহিক এই বিনিয়োগ প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে টেলিনর কার্যত এশিয়ার অধিকাংশ বাজার থেকেই বেরিয়ে এসেছে। বর্তমানে এ অঞ্চলে তাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে মাত্র দুটি দেশে—মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাংলাদেশ থেকেই ১৯৯৭ সালে গ্রামীণফোন চালুর মাধ্যমে টেলিনরের এশিয়া যাত্রা শুরু হয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এশিয়ায় নিজেদের উপস্থিতি নতুন করে মূল্যায়নের অংশ হিসেবে বাংলাদেশে টেলিনরের কার্যক্রম, বিশেষ করে গ্রামীণফোনের ভবিষ্যৎ কোন পথে?
গত সপ্তাহে টেলিনর এ বিষয়ে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে সতর্ক ইঙ্গিত দিয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টেলিনর গ্রুপের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা টরবিয়র্ন উইস্ট বলেন, এশিয়ায় টেলিনরের অবশিষ্ট সম্পদ—এর মধ্যে গ্রামীণফোনও রয়েছে—ভবিষ্যতে কোনো চুক্তির আওতায় আসতে পারে। গ্রামীণফোনে টেলিনরের মালিকানা বর্তমানে ৫৫ দশমিক ৮ শতাংশ।
“যতক্ষণ না কোনো সুযোগ সামনে আসে, ততক্ষণ সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে চলবে,” বলেন টরবিয়র্ন উইস্ট।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে টেলিনর এশিয়ার প্রধান জন ওমুন্ড রেভহাউগও একই সুরে কথা বলেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, “গ্রুপ সিএফও যা বলেছেন, আমিও সেটিই পুনরায় বলছি। কোনো সুযোগ না আসা পর্যন্ত বাংলাদেশে আমরা পূর্ণ মনোযোগ ও অঙ্গীকার নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে যাব।”
তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, এটিই প্রথমবার যখন টেলিনরের শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে—যদিও সংযত ভাষায়—গ্রামীণফোন ভবিষ্যতে কোনো চুক্তির অংশ হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিলেন।
মাত্র দেড় বছর আগেও টেলিনরের অবস্থান ছিল অনেক বেশি দৃঢ়। ২০২৪ সালের ৩ এপ্রিল বাংলাদেশের দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টেলিনর গ্রুপের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও সিইও সিগভে ব্রেকে স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, “আমরা বাংলাদেশের প্রতি খুবই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
সে সময় টেলিনর থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় স্থানীয় একীভূতকরণের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম পুনর্গঠন করছিল, যেখানে তারা পরবর্তীতে সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারে পরিণত হয়। তখনকার কৌশল ছিল—এশিয়ায় থাকা, তবে সরাসরি পরিচালন ঝুঁকি কমানো।
এশিয়ায় টেলিনরের দীর্ঘ পথচলা
গ্রামীণফোনের সাফল্যের হাত ধরেই টেলিনর বাংলাদেশ থেকে এশিয়ার অন্যান্য বাজারে বিস্তার লাভ করে। এরপর তারা থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, মিয়ানমার ও ভারতে কার্যক্রম শুরু করে। তবে সব বাজারেই দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি ধরে রাখতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
ভারতে প্রায় আট বছর থাকার পর ২০১৭ সালে টেলিনর বাজার ছাড়ে। মিয়ানমারে ২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করলেও ২০২২ সালে সামরিক অভ্যুত্থান ও জান্তা সরকারের নতুন বিধিনিষেধের কারণে সেখান থেকেও বেরিয়ে যায়।
বর্তমানে এশিয়ায় টেলিনরের উপস্থিতি রয়েছে শুধু বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায়। মালয়েশিয়ায় ২০২২ সালের শেষ দিকে একীভূতকরণের মাধ্যমে গঠিত সেলকমডিজি বেরহাদে টেলিনরের অংশীদারিত্ব ৩৩ দশমিক ১ শতাংশ। সেখানে তারা সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডার এবং পরিচালন নিয়ন্ত্রণ সীমিত।
বাংলাদেশে পরিস্থিতি ভিন্ন। গ্রামীণফোনের মাধ্যমে টেলিনরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি দেশের মোট মোবাইল গ্রাহকের প্রায় ৪৫ শতাংশকে সেবা দেয়, টেলিকম খাতের প্রায় অর্ধেক রাজস্ব এবং প্রায় ৮৮ শতাংশ মুনাফা আসে গ্রামীণফোন থেকে। একই সঙ্গে এটি দেশের শেয়ারবাজারের সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানি।
বিভক্ত শিল্পখাত
টেলিনর–গ্রামীণফোনের ভবিষ্যৎ নিয়ে টেলিকম খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের মধ্যেও মতভেদ রয়েছে। একাধিক নির্বাহী মনে করেন, বাংলাদেশ এখনো টেলিনরের এশিয়ায় সবচেয়ে লাভজনক বাজার।
এক জ্যেষ্ঠ নির্বাহী বলেন, “গ্রামীণফোন শুধু লাভজনক নয়, এখানে টেলিনরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা রয়েছে। এটি টেলিনরকে নিয়ন্ত্রণ ও কৌশলগত স্বাচ্ছন্দ্য দেয়, যা অন্য কোনো এশিয়ান বাজারে তাদের নেই।”
তবে অন্য একটি অংশ ভিন্ন চিত্র দেখছেন। তাঁদের মতে, টেলিনরের সামগ্রিক কৌশল বদলে গেছে। “নর্ডিক অঞ্চল ছাড়া অন্যান্য অ-কোর বাজার থেকে ধীরে ধীরে পুঁজি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশের টেলিকম বাজারের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও হ্রাস পাচ্ছে,” বলেন এক শীর্ষ নির্বাহী।
টেলিকম খাতে আদর্শভাবে বছরে অন্তত ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত হলেও গ্রামীণফোনের রাজস্ব ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের প্রথম তিন প্রান্তিকে প্রায় ১ শতাংশ কমেছে। যদিও আর্থিক ব্যয় কমে যাওয়ায় ২০২৪ সালে মুনাফা কিছুটা বেড়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই বড় কোনো সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এক নির্বাহীর ভাষায়, “টেলিনর যদি বাংলাদেশ নিয়ে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তা আর বিস্ময়ের হবে না।”














