বিগত কয়েক বছরে জমে থাকা প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বীমা দাবি (ক্লেইম) নিষ্পত্তি করা এবং পলিসিধারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে বীমা খাতকে পুনরুজ্জীবিত করাই হবে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) প্রধান অগ্রাধিকার বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আইডিআরএ ইতোমধ্যে সবচেয়ে আর্থিক সংকটে থাকা সাতটি বীমা কোম্পানির সঙ্গে কাজ শুরু করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে মোট বকেয়া দাবির প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা আটকে রয়েছে। চেয়ারম্যান জানান, কোম্পানিগুলোর সম্পদ বিক্রি করে পর্যায়ক্রমে সেই অর্থ দিয়ে বকেয়া দাবি পরিশোধের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, কমিশন বাণিজ্য বন্ধ, রিস্ক-বেইজড সুপারভিশন চালু, প্রতিটি পলিসির জন্য ইউনিক পলিসিহোল্ডার আইডি, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সত্যতা যাচাই এবং আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণসহ একাধিক সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আস্থা ফেরানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, "পলিসিধারীরা যদি বছরের পর বছর তাদের দাবি না পান, তাহলে মানুষ বীমা করতে আগ্রহ হারাবে। তাই আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো যত দ্রুত সম্ভব বকেয়া দাবি পরিশোধ শুরু করা। দাবি পরিশোধ শুরু হলে ধীরে ধীরে মানুষের আস্থা ফিরে আসবে।"
তিনি জানান, গত দুই সপ্তাহে সবচেয়ে সংকটে থাকা সাতটি বীমা কোম্পানির উদ্যোক্তা, পরিচালনা পর্ষদ এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছে আইডিআরএ। বৈঠকে তাদের সম্পদ, বিনিয়োগ, দায় এবং আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনা করা হয়েছে। যেসব সম্পদের মূল্য নিয়ে সন্দেহ রয়েছে, সেগুলোর নতুন করে মূল্যায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সম্পদ বিক্রি করে দাবি পরিশোধ
চেয়ারম্যান বলেন, সরকারি ট্রেজারি বন্ড, আর্থিকভাবে শক্তিশালী ব্যাংকে রাখা স্থায়ী আমানত (এফডিআর) এবং অন্যান্য বাজারযোগ্য বিনিয়োগ পর্যায়ক্রমে নগদায়ন করা হবে।
এই অর্থ প্রতিটি কোম্পানির জন্য পৃথক ব্যাংক হিসাবে স্বাধীন নিরীক্ষকের তত্ত্বাবধানে জমা রাখা হবে, যাতে পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়।
এরপর "ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট" নীতিতে দাবি নিষ্পত্তি করা হবে। অর্থাৎ যারা আগে দাবি জমা দিয়েছেন, তারা আগে অর্থ পাবেন।
তিনি আরও জানান, দুর্বল ব্যাংকে আটকে থাকা আমানতের সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে আইডিআরএ।
গোপন কমিশন বন্ধে ব্যবস্থা
মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বেতন, পরামর্শক ফি বা বিভিন্ন চুক্তির আড়ালে পরোক্ষভাবে কমিশন দেওয়া হয়, যা বীমা কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে।
এ ধরনের গোপন কমিশন শনাক্ত ও বন্ধে নতুন ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে এবং আগামী এক মাসের মধ্যেই এ বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নিয়মিত আর্থিক নজরদারি
তিনি বলেন, বর্তমানে বীমা কোম্পানিগুলোর জমা দেওয়া আর্থিক বিবরণী অনেক সময় পুরোনো তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। ফলে তাদের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
নতুন কাঠামোর আওতায় নিয়মিত হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হবে। এতে ঝুঁকি, তারল্য সংকট ও অনিয়ম আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
প্রতিটি পলিসির জন্য ইউনিক আইডি
চেয়ারম্যান জানান, প্রতিটি বৈধ বীমা পলিসির জন্য একটি ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন নম্বর দেওয়া হবে, যা সরাসরি গ্রাহকের মোবাইল ফোনে পাঠানো হবে।
তিনি বলেন, "কোনো গ্রাহক যদি ইউনিক আইডি না পান, তাহলে তিনি যেন প্রিমিয়াম পরিশোধ না করেন।"
এই উদ্যোগ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে দেশব্যাপী প্রচারণাও চালানো হবে।
জাল সনদ যাচাই
জ্যেষ্ঠ বীমা কর্মকর্তাদের জাল শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার রোধে আন্তর্জাতিক ডাটাবেস ব্যবহার, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় এবং ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি)-এর মাধ্যমে পটভূমি যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে বলে জানান চেয়ারম্যান।
পরিচালকদের ব্যক্তিগত সম্পদ বাজেয়াপ্ত নয়
আর্থিকভাবে দুর্বল বীমা কোম্পানির ওপর আরোপিত জরিমানা পরিচালকদের ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে আদায় করা সম্ভব কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমান আইনে সে সুযোগ নেই।
তবে ভবিষ্যতে আইন সংস্কারের মাধ্যমে বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
অনিয়মের প্রমাণ মিললে আইনি ব্যবস্থা
মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, বীমা খাত দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যায় ভুগছে, যা একসঙ্গে সমাধান করা সম্ভব নয়।
তবে কোনো প্রতিষ্ঠানে অর্থ আত্মসাৎ বা অন্য কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং আত্মসাৎ করা অর্থ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগও গ্রহণ করা হবে।















