ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশে স্বয়ংক্রিয় ব্যাংকিং লেনদেনে ব্যাপক ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে। এটিএম (অটোমেটেড টেলার মেশিন), ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্ল্যাটফর্মগুলোতে বেড়েছে গ্রাহকদের চাপ। বছরের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে এই লেনদেনের চাপ সামাল দিতে আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ঈদের আগে ও ছুটিকালীন সময়ে এটিএম, ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং এমএফএসের ব্যবহার ৫০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। রাজধানীর রামপুরা, বেইলি রোড, ধানমন্ডি, বনানী ও এলিফ্যান্ট রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় এটিএম বুথ ও এমএফএস পয়েন্টগুলোতে গত কয়েকদিন ধরে গ্রাহকদের অতিরিক্ত ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, ঈদের ছুটিতে নিরবচ্ছিন্ন আর্থিক লেনদেন নিশ্চিত করতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সার্বক্ষণিক এটিএম সেবা চালু রাখা, পর্যাপ্ত নগদ অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দিলে তা দ্রুত সমাধান করা।
তিনি আরও বলেন, পয়েন্ট অব সেল (পিওএস), কিউআর কোড, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, অনলাইন ই-পেমেন্ট গেটওয়ে ও এমএফএস সেবাও যাতে নির্বিঘ্ন থাকে, সে বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এটিএম বুথের নিরাপত্তা জোরদার এবং প্রতারণা রোধে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের সচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
এমএফএস সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিকাশ, রকেট ও নগদসহ সব প্ল্যাটফর্মকেই নিরবচ্ছিন্ন লেনদেন নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ বলেন, ঈদের আগে এটিএম ব্যবহারের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। “এই সময় আমাদের গ্রাহক ছাড়াও অন্যান্য ব্যাংকের গ্রাহকরাও আমাদের এটিএম ব্যবহার করেন। ফলে লেনদেনের চাপ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি থাকে,” বলেন তিনি।
গ্রাহকদের বাড়তি নগদ চাহিদা বিবেচনায় রেখে নিয়মিতভাবে এটিএমে টাকা সরবরাহসহ বিকল্প চ্যানেলের মাধ্যমে নগদ প্রবাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তার মতে, বড় উৎসবের সময় এটিএম ব্যবহারের হার সাধারণত ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
এদিকে, বাড়তি তারল্য চাহিদা মেটাতে আন্তঃব্যাংক কলমানি বাজারেও লেনদেন বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের ১৫ মার্চ পর্যন্ত শেষ ১১ কার্যদিবসে কলমানি বাজারে লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৭৪ বিলিয়ন টাকা, যা আগের ১১ কার্যদিবসে ছিল ৪৯১ বিলিয়ন টাকা।
বিকাশের করপোরেট কমিউনিকেশনের প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার দালিম বলেন, ডিজিটাল লেনদেনের সহজলভ্যতার কারণে এমএফএস খাত গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত হয়েছে। বিশেষ করে ঈদ, পূজা বা অন্যান্য উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের খরচ বেড়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে লেনদেনের পরিমাণে।
তিনি জানান, ঈদের সময় বেতন-বোনাস প্রদান, প্রবাসী আয়, কেনাকাটা, রেস্টুরেন্টে খাওয়া, ভ্রমণ এবং যাকাত প্রদানের মতো বিভিন্ন কারণে লেনদেনের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
উৎসবকে কেন্দ্র করে গ্রাহকদের ডিজিটাল লেনদেনে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন ক্যাশব্যাক ও ছাড়ের অফারও দিচ্ছে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো। চলতি রমজান মাসজুড়ে বিকাশের মাধ্যমে পোশাক, জুতা, ইলেকট্রনিকস, নিত্যপণ্য কেনা, ইফতার-সেহরি অর্ডার, টিকিটিং ও হোটেল বুকিংয়ে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্যাশব্যাক ও ছাড়ের সুবিধা পাচ্ছেন গ্রাহকরা।
সামগ্রিকভাবে, ঈদকে কেন্দ্র করে ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনের এই ঊর্ধ্বগতি দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও নগদহীন অর্থনীতির দিকে অগ্রগতির ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করছে।












