ছবি: বিমানের ওয়েবসাইট
জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে (বিমান) পাইলটদের লাইসেন্স জালিয়াতি, অনিয়ম এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে অভ্যন্তরীণ এক তদন্তে। যাত্রীদের জীবন যাদের হাতে নিরাপদ থাকার কথা, সেই পাইলটদের বিরুদ্ধেই উঠেছে গুরুতর অভিযোগ—জাল ফ্লাইট রেকর্ড, নিয়ম ভঙ্গ এবং শাস্তিহীনতার সংস্কৃতি।
বিমানের এক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একাধিক জ্যেষ্ঠ পাইলট জাল নথি জমা দিয়ে তাদের ক্যারিয়ার এগিয়ে নিয়েছেন। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্তদের উড্ডয়ন চালিয়ে যেতে দেওয়া হয়েছে।
তদন্তের সূচনা:
চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি পাঁচজন পাইলটের বিরুদ্ধে জাল লাইসেন্সের অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করে বিমান। ৩ ফেব্রুয়ারি জমা দেওয়া প্রতিবেদনে দুই জ্যেষ্ঠ পাইলট—ক্যাপ্টেন আব্দুল বাসিত মাহতাব ও ক্যাপ্টেন আব্দুর রহমান আখন্দ—ইচ্ছাকৃতভাবে ভুয়া নথি জমা দিয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়। অন্য তিনজনের লাইসেন্সেও অসংগতি পাওয়া গেছে।
কমিটি তদন্ত চলাকালে চারজনকে গ্রাউন্ড করার সুপারিশ করলেও কর্তৃপক্ষ তা উপেক্ষা করে তাদের উড্ডয়ন চালিয়ে যেতে দেয়।
মাহতাবের লাইসেন্সে অসংগতি:
প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্যাপ্টেন মাহতাব ১৯৯৩ সালে কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স পান। কিন্তু তার জমা দেওয়া ফ্লাইট ঘণ্টার তথ্য পরস্পরবিরোধী।
এক নথিতে তার পাইলট-ইন-কমান্ড হিসেবে অভিজ্ঞতা দেখানো হয়েছে মাত্র ৩৩ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট। অন্য একটি নথিতে একই সময়ে তা দেখানো হয়েছে ১৫৫ ঘণ্টা।
তদন্তে আরও বলা হয়, তিনি প্রয়োজনীয় ফ্লাইট ঘণ্টা পূরণ না করেই ইনস্ট্রুমেন্ট রেটিং পান, যা নিয়মবহির্ভূত। তবুও বিশেষ বিবেচনায় তাকে ছাড় দেওয়া হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, “তার কমার্শিয়াল পাইলট লাইসেন্স এ সমস্যা থাকলে পরবর্তী সব লাইসেন্স ও রেটিং প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।”
তবে মাহতাব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, তদন্ত পক্ষপাতদুষ্ট এবং তাকে সাক্ষাৎকারের সুযোগ দেওয়া হয়নি।
আখন্দের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ:
ক্যাপ্টেন আব্দুর রহমান আখন্দের বিরুদ্ধেও জাল নথি জমা দিয়ে লাইসেন্স নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তদন্তে দেখা যায়, তিনি প্রয়োজনীয় ২৫০ ঘণ্টা ফ্লাইট অভিজ্ঞতা পূরণ করেননি। এছাড়া তার বিরুদ্ধে ভুয়া ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট জমা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
চীনে বড় দুর্ঘটনা এড়ানো:
এই তদন্ত চলাকালেই ২৩ জানুয়ারি চীনের গুয়াংজু বিমানবন্দরে আখন্দ ভুল ট্যাক্সিওয়ে ব্যবহার করেন, যা বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করে। এ ঘটনায় চীনা কর্তৃপক্ষ তদন্ত দাবি করে এবং বিমানের স্লট বাতিলের হুঁশিয়ারি দেয়।
যৌন হয়রানির অভিযোগেও দায়িত্বে পাইলট:
অন্য এক পাইলট ক্যাপ্টেন ইউসুফ মাহমুদের বিরুদ্ধে কেবিন ক্রুকে যৌন হয়রানির অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তদন্ত চলাকালে তাকে উড্ডয়ন চালিয়ে যেতে দেওয়া হয়।
তদন্তে বলা হয়, তিনি এক এয়ার হোস্টেসকে অশোভন স্পর্শ, অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য এবং জোরপূর্বক আচরণ করেছেন। সহ-পাইলটও তার আচরণকে হয়রানি হিসেবে স্বীকার করেন।
আরও অনিয়ম
ক্যাপ্টেন আনিসুর রহমান ও ক্যাপ্টেন ফারিয়েল বিলকিস আহমেদের ক্ষেত্রেও ফ্লাইট ঘণ্টা সংক্রান্ত অসংগতি পাওয়া গেছে। তবে এসব ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত জালিয়াতি হয়েছে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা প্রশ্নের মুখে
বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা বিষয়টি সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশকে জানিয়েছে, তবে এখনো কোনো নির্দেশনা পায়নি।
বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়রা সুলতানা বলেন, সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশের জবাব না পাওয়ায় আমরা এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।”
অন্যদিকে সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশ নিজস্ব তদন্ত শুরু করলেও মাঝপথে প্রধান কারিগরি কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে, যা তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ:
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাইলট লাইসেন্সে জালিয়াতি শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, এটি সরাসরি যাত্রীদের জীবনের জন্য হুমকি। যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে দেশের বিমান চলাচল খাত আন্তর্জাতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিমানের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি এখন প্রকাশ্যে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে—এখন কি কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, নাকি আগের মতোই দায় এড়ানোর সংস্কৃতি চলবে?
ডেইলি স্টার থেকে বাংলায় অনুবাদ















