ঢাকা || ২২ জুলাই ২০২৬

সংযুক্ত আরব আমিরাতে বন্ধের ঝুঁকিতে জনতা ব্যাংকের চার শাখা

মূলধন ঘাটতির কারণে কঠোর নিষেধাজ্ঞা; সোনালী ব্যাংকের যুক্তরাজ্য অধ্যায়ের পর রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের বিদেশি কার্যক্রমে নতুন সংকট

সংযুক্ত আরব আমিরাতে বন্ধের ঝুঁকিতে জনতা ব্যাংকের চার শাখা

ব্যাংক ইনফো

প্রকাশিত: ০০:৪৪, ২৩ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বিদেশি কার্যক্রমে আবারও বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) পরিচালিত জনতা ব্যাংকের চারটি শাখা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থ হওয়ায় দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক (সিবিইউএই) জনতা ব্যাংকের ওপর একাধিক কঠোর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা আরোপ করেছে। একই সঙ্গে ব্যাংকটিকে নতুন গ্রাহক নেওয়া বন্ধ করে ধীরে ধীরে বিদ্যমান কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

চার বছর আগে যুক্তরাজ্যে সোনালী ব্যাংকের ব্যাংকিং লাইসেন্স বাতিল হওয়ার পর এটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোনো বাংলাদেশি ব্যাংকের বিদেশি কার্যক্রমে সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

৩০০ মিলিয়ন দিরহামের মূলধন ঘাটতি

ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধিমালা অনুযায়ী, দেশটিতে পরিচালিত জনতা ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন (Paid-up Capital) ন্যূনতম ৪০০ মিলিয়ন দিরহাম হতে হবে। বর্তমানে ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন রয়েছে মাত্র ১০০ মিলিয়ন দিরহাম। ফলে ৩০০ মিলিয়ন দিরহাম বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

এই ঘাটতির কারণে ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংক জনতা ব্যাংকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সংরক্ষিত হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। পাশাপাশি নতুন হিসাব খোলা ও নতুন গ্রাহক গ্রহণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান আমানতকারী ও দায়দেনা পরিশোধে অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যক্রম ধাপে ধাপে গুটিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারকে চিঠি

গত ৮ জুলাই ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহকারী গভর্নর আহমেদ সাঈদ আল কামজি জনতা ব্যাংকের ইউএই অঞ্চলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুজ্জামানকে চিঠি দিয়ে পরিচালনা পর্ষদকে বিষয়টি দ্রুত জানাতে এবং ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অবহিত করতে নির্দেশ দেন।

পরদিন ৯ জুলাই একই সিদ্ধান্ত জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাজিবুর রহমান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অফ-সাইট সুপারভিশন বিভাগকেও জানানো হয়।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১৪ জুলাই অনুষ্ঠিত জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সমন্বয়ে জরুরি বৈঠক আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়। একই দিনে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবকে চিঠি দেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

তিন বছরে মূলধন বাড়ানোর প্রস্তাব

জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাজিবুর রহমান জানিয়েছেন, ২০১৬ সাল থেকে ইউএই শাখাগুলোর অর্জিত সব মুনাফা দেশে না এনে সেখানেই মূলধনে যোগ করা হয়েছে। এর ফলে পরিশোধিত মূলধন ৭৫ মিলিয়ন দিরহাম থেকে বেড়ে ১০০ মিলিয়ন দিরহামে উন্নীত হয়েছে।

তিনি বলেন, তিন বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় মূলধন বাড়ানোর প্রস্তাব ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে দেওয়া হয়েছে। যদি এই প্রস্তাব গ্রহণ না করা হয়, তাহলে সরকারের সহায়তায় প্রয়োজনীয় মূলধন জোগাড়ের চেষ্টা করা হবে।

ব্যাংকের আর্থিক অবস্থাও উদ্বেগের কারণ

ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের চিঠিতে জানিয়েছে, শুধু স্থানীয় মূলধন ঘাটতিই নয়, বাংলাদেশে জনতা ব্যাংকের সামগ্রিক আর্থিক অবস্থাও তাদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ।

২২ এপ্রিলের আরেকটি চিঠিতে ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংক উল্লেখ করে, ২০২৪ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের মূলধনও ইউএই বিধিমালায় নির্ধারিত ন্যূনতম ২ বিলিয়ন দিরহামের সমপর্যায়ের নিচে নেমে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে জনতা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল ৫২ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা। চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়ায় ৫০ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। একই সময়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে হয় ৭৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৭৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

তবে এ বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাজিবুর রহমান বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে ২০ শতাংশের বেশি ঋণ খেলাপি হলেও জনতা ব্যাংক জরুরি তারল্য সহায়তা ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

১৯৭৬ সাল থেকে ইউএইতে কার্যক্রম

জনতা ব্যাংক ১৯৭৬ সালের অক্টোবরে ইউএইতে কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে আবুধাবি, দুবাই, শারজাহ ও আল-আইনে ব্যাংকটির চারটি শাখা রয়েছে।

এসব শাখা মূলত প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স সেবা, এনআরবি ব্যাংকিং, আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত এলসি, ট্রেড ফাইন্যান্স, ব্যাংক গ্যারান্টি, আমানত সংগ্রহ ও বাণিজ্যিক ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে।

ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, ২০২০ সাল পর্যন্ত ইউএই কার্যক্রম থেকে ৩২ মিলিয়ন দিরহাম মুনাফা অর্জিত হয়, যার মধ্যে ২৫ মিলিয়ন দিরহাম মূলধনে যোগ করা হয়েছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকার প্রয়োজনীয় মূলধন দিতে না পারলে ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধি অনুসারেই শাখাগুলো বন্ধের প্রক্রিয়া এগোবে। এ ক্ষেত্রে আমানত, দায়দেনা ও মূলধনের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ব্যয়বহুল একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

সোনালী ব্যাংকের যুক্তরাজ্য অভিজ্ঞতা

জনতা ব্যাংকের বর্তমান সংকটের আগে বিদেশে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায় সোনালী ব্যাংক। ১৯৯৯ সালে লন্ডনে কার্যক্রম শুরু করা ব্যাংকটি অর্থপাচার প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রক সংস্থার জরিমানার মুখে পড়ে।

পরবর্তীতে আর্থিক অনিয়ম ও নিয়ন্ত্রক চাপের মধ্যে ২০২২ সালের আগস্টে যুক্তরাজ্যের প্রুডেনশিয়াল রেগুলেশন অথরিটি ব্যাংকটির লাইসেন্স বাতিল করে। পরে প্রতিষ্ঠানটি **সোনালী বাংলাদেশ (ইউকে) লিমিটেড** নামে পুনর্গঠিত হয় এবং খুচরা ব্যাংকিং বন্ধ করে কেবল ট্রেড ফাইন্যান্স ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

এর পাশাপাশি গঠিত **সোনালী পে (ইউকে) লিমিটেড** এবং নতুন আর্থিক প্রতিষ্ঠানও ধারাবাহিক লোকসানে রয়েছে এবং টিকে থাকতে বাংলাদেশ থেকে মূলধন সহায়তা নিতে হচ্ছে।

বিদেশে অন্যান্য রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের অবস্থাও চ্যালেঞ্জের

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংকের সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার এক্সচেঞ্জ হাউস দুটি রেমিট্যান্স আহরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় সেখানে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও সুশাসনের ঘাটতির তথ্য উঠে এসেছে।

ব্যাংকের ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ব্যাংকিং নীতিমালা, আর্থিক শৃঙ্খলা ও সুশাসনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন, যার অনেকগুলোই সরাসরি ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

বিদেশি কার্যক্রমের মুনাফা কমছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের **ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট-২০২৪** অনুযায়ী, বিদেশে পরিচালিত বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর শাখা ও এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোর সম্মিলিত নিট মুনাফা ২০২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৯৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ কম।

একই সময়ে এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত সম্পদের ওপর মুনাফার হার (রিটার্ন অন অ্যাসেটস-আরওএ) ১ দশমিক ৭৪ শতাংশ থেকে কমে ১ দশমিক ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে জনতা ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক ও এবি ব্যাংক বিদেশে মোট সাতটি পূর্ণাঙ্গ শাখা পরিচালনা করছে। এছাড়া আরও ২১টি বাংলাদেশি ব্যাংক বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ২১টি এক্সচেঞ্জ হাউসের মাধ্যমে রেমিট্যান্স সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জনতা ব্যাংকের ইউএই শাখাগুলোর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শুধু একটি ব্যাংকের সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর বিদেশি উপস্থিতি, আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর আস্থা এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের ব্যাংকিং সেবার ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। সরকার দ্রুত প্রয়োজনীয় মূলধন জোগান দিতে না পারলে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের বৈশ্বিক কার্যক্রম আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।