ঢাকা || ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তরুণ উদ্যোক্তায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ৫০০ কোটি

তরুণ উদ্যোক্তায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ৫০০ কোটি

ব্যাংক ইনফো

প্রকাশিত: ০৮:৪৭, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দেশের প্রতিটি উপজেলায় সম্ভাবনাময় ১০ জন তরুণ উদ্যোক্তা চিহ্নিত করে তাঁদের প্রত্যেককে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণ ও শর্তসাপেক্ষ অনুদানের সমন্বয়ে এ অর্থায়ন করা হবে।

‘উপজেলা ভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’ নামে এ উদ্যোগের আওতায় প্রাথমিকভাবে দেশের আট বিভাগের আট জেলায় কার্যক্রম শুরু হবে। সফল হলে পর্যায়ক্রমে তা দেশের সব জেলা ও উপজেলায় সম্প্রসারণ করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, উদ্যোক্তার ধরন ও ব্যবসায়িক চাহিদা বিবেচনায় ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন করা হবে। যে উদ্যোক্তা যে খাতের সঙ্গে যুক্ত, তাঁকে সংশ্লিষ্ট খাতের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে ঋণ দেওয়া হবে। এ ঋণের সুদের হার হবে ৪ থেকে ৭ শতাংশ।

এর পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে শর্তসাপেক্ষ অনুদান দেওয়া হবে। অনুদানের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার করলে তা ফেরত দিতে হবে না। তবে অর্থের যথাযথ ব্যবহার না হলে অনুদানের অর্থ ঋণে রূপান্তর করা হবে।

৫০০ কোটি টাকার তহবিল

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৩০ আগস্টের সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ৮ বিভাগের ৬৪ জেলায় মোট ৫০৩টি উপজেলা রয়েছে। প্রতি উপজেলায় ১০ জন করে মোট ৫ হাজার ৩০ জন উদ্যোক্তাকে অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এ জন্য ৫০০ কোটি টাকার একটি তহবিল অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক দেবে ২৫০ কোটি টাকা এবং বাকি ২৫০ কোটি টাকা দেবে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো। তহবিলের একটি অংশ বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকগুলোর সিএসআর কর্মসূচি থেকে আসবে।

কর্মসূচিটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, অর্থায়নে ঋণের পাশাপাশি শর্তসাপেক্ষ অনুদান থাকবে। উদ্যোক্তাদের শুরুর খরচ মেটাতে প্রথমে অনুদানের একটি অংশ দেওয়া হবে। বাকি অংশ আলাদা হিসাবে সংরক্ষণ করা হবে। উদ্যোক্তার ঋণ পরিশোধের আগ্রহ ও নির্দিষ্ট মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে ওই অর্থ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের প্রাথমিক মূলধনের সংকট দূর করার পাশাপাশি ব্যবসা টেকসই করা এবং ঋণ পরিশোধে তাঁদের উৎসাহিত করা সম্ভব হবে।

যেভাবে উদ্যোক্তা নির্বাচন

কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন উপজেলা থেকে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তাদের আবেদন গ্রহণ, যাচাই-বাছাই ও সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত করা হবে। এরপর তাঁদের ব্যবসায়িক সম্ভাবনা, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও প্রকৃত অর্থায়ন চাহিদা মূল্যায়ন করে চূড়ান্তভাবে উদ্যোক্তা নির্বাচন করা হবে।

উদ্যোক্তা নির্বাচনে বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা অফিস, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও বিশেষজ্ঞরা যৌথভাবে কাজ করবেন। প্রতিটি জেলায় একটি ব্যাংক এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রত্যন্ত ও উপজেলা পর্যায়ে অনেক তরুণের ব্যবসায়িক ধারণা ও সম্ভাবনা থাকলেও প্রাথমিক মূলধন, ব্যবসায়িক পরামর্শ, প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক ও ব্যাংক অর্থায়নের অভাবে তাঁরা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারেন না। তাঁদের চিহ্নিত করে অর্থায়নের আওতায় আনাই এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।

কর্মকর্তাদের মতে, উদ্যোক্তাদের একটি অংশও যদি সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ব্যবসার বিকাশ ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

প্রশিক্ষণ ও পেশাদার নির্বাচনের ওপর জোর

উদ্যোক্তা অর্থায়নবিষয়ক পরামর্শক শওকত হোসেন বলেন, উদ্যোগটি ভালো হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে সঠিক বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে ইইএফ তহবিলের অর্থায়নে অনিয়মের অভিজ্ঞতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি উদ্যোক্তা নির্বাচনে সতর্কতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেন।

ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, উদ্যোক্তা নির্বাচন পেশাদারভাবে করতে হবে। তাঁদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর অর্থায়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অনুদানের অর্থ ধাপে ধাপে দেওয়া হলে এ উদ্যোগ থেকে বড় ফল পাওয়া সম্ভব।

বাস্তবায়ন ব্যয়ও নির্ধারণ

উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা চিহ্নিতকরণ, প্রচার, আবেদন যাচাই, সভা ও কর্মশালা আয়োজন, ব্যবসায়িক ধারণা মূল্যায়ন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আলাদা ব্যয় রাখা হয়েছে। এসব প্রশাসনিক ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত ব্যয় বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএমএসএমই তহবিল থেকে বহন করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণ উদ্যোক্তারা প্রচলিত ব্যাংকঋণের পাশাপাশি শর্তসাপেক্ষ অনুদানের সুযোগ পাবেন। এর মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উপজেলা পর্যায়ে ক্ষুদ্র ব্যবসার বিকাশে নতুন একটি অর্থায়ন কাঠামো তৈরি হতে পারে।