ঢাকা || ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

১০০ টাকার ঋণে ৩৩ টাকাই খেলাপি

১০০ টাকার ঋণে ৩৩ টাকাই খেলাপি

ব্যাংক ইনফো

প্রকাশিত: ০৮:৫৩, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আবারও ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন—তিন মাসে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। জুন শেষে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা।

ব্যাংক খাতের মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ এখন খেলাপি। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো যে ১০০ টাকা ঋণ দিয়েছে, তার প্রায় ৩৩ টাকা আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এর ফলে ব্যাংকের অর্থায়ন সক্ষমতা কমার পাশাপাশি আমানতকারীদের অর্থও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম, জালিয়াতি, বেনামি ঋণ ও নানা ধরনের আর্থিক দুর্বলতার প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে শুরু করেছে। এর ফলে কাগজে-কলমে আড়ালে থাকা বিপুল পরিমাণ সমস্যাগ্রস্ত ঋণ এখন খেলাপি হিসেবে স্বীকৃত হচ্ছে।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘খেলাপি ঋণ হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। চলমান সম্পদ মান পর্যালোচনার ফলে ব্যাংক খাতের প্রকৃত দুর্বলতা এখন প্রকাশ পাচ্ছে। আগে পুনঃতফসিল, বিশেষ ছাড় ও হিসাবগত পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক সমস্যাগ্রস্ত ঋণ আড়ালে ছিল।’

তিন মাসে বাড়ল ১৭ হাজার কোটি

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা।

এর আগে গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছিল ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। ফলে জানুয়ারি-জুন—এই ছয় মাসে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের বোঝা বেড়েছে ৪৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, মূলত খেলাপি ঋণের ওপর নিয়মিত হারে সুদ যুক্ত হতে থাকা এবং অনেক আগের অনাদায়ী ঋণ হিসাবভুক্ত হওয়ার কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। খেলাপি ঋণ কমাতে ইতিমধ্যে ঋণ পুনঃতফসিলের নীতিগত সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণের হার কিছুটা কমে আসবে বলে তিনি আশা করেন।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ব্যাখ্যার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করছেন কয়েকজন ব্যাংকার। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, খেলাপি ঋণের ওপর সুদ যুক্ত হয় না। তাঁর মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেওয়া বিপুল পরিমাণ ভুয়া ও বেনামি ঋণ খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।

১৫ বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২৭ গুণ

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। প্রায় ১৫ বছর পর ২০২৪ সালের জুনে শেখ হাসিনা সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির ঠিক আগে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা।

এরপর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের গোপন থাকা তথ্য ও প্রকৃত আর্থিক চিত্র সামনে আসতে শুরু করে। দেশি-বিদেশি নিরীক্ষা ও সম্পদমান যাচাইয়ের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত দুর্বলতা চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এতে ব্যাংক খাতে তারল্যসংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঋণ পুনঃতফসিল, সুদ মওকুফ এবং এককালীন অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এসব সুবিধা আরও বাড়ানো হয়েছে।

তবে খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বারবার পুনঃতফসিলের মাধ্যমে সাময়িকভাবে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ কমানো গেলেও এতে ব্যাংক খাতের মৌলিক দুর্বলতা দূর হবে না।

ঋণ প্রবৃদ্ধি কমায় খেলাপি বাড়ছে: ব্যাংকাররা

ব্যাংকারদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক উদ্যোক্তা চাপের মধ্যে পড়েছেন। একই সময়ে নতুন ঋণ বিতরণও অনেক কমে গেছে। বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে। তাঁর আশা, সামনে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে আসবে।