সরকারি সিকিউরিটিজের দ্বিতীয় বাজারের লেনদেনে বড় ধরনের কেন্দ্রীভবন দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশের মাত্র ১০টি ব্যাংক মোট লেনদেনের ৭২ দশমিক ৫৩ শতাংশ করেছে। ফলে লাইসেন্সপ্রাপ্ত বাকি শত শত ট্রেডারকে বাজারের ২৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে সরকারি সিকিউরিটিজের দ্বিতীয় বাজারে মোট লেনদেন হয়েছে ৫ লাখ ২৭ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে শীর্ষ ১০ ব্যাংক লেনদেন করেছে ৩ লাখ ৮২ হাজার ৭০২ কোটি টাকা।
এ বাজারে সবচেয়ে বেশি লেনদেন করেছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)। মোট লেনদেনের প্রায় ১৭ শতাংশ বা ৮৯ হাজার ২২৫ কোটি টাকার সরকারি সিকিউরিটিজ লেনদেন করেছে ব্যাংকটি। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ইস্টার্ন ব্যাংকের অংশ ৯ দশমিক ৪০ শতাংশ, যার পরিমাণ প্রায় ৪৯ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা। ব্র্যাক ব্যাংক ৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ বা প্রায় ৪৬ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা লেনদেন করে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।
শীর্ষ তিন ব্যাংক মিলে মোট লেনদেনের ৩৫ দশমিক ১০ শতাংশ করেছে। অর্থাৎ দ্বিতীয় বাজারে প্রতি ১০০ টাকার লেনদেনের মধ্যে ৩৫ টাকার বেশি হয়েছে এই তিন ব্যাংকের মাধ্যমে।
শীর্ষ ১০ ব্যাংকের তালিকায় আরও রয়েছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, জামুনা ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ৮ দশমিক ২৮ শতাংশ বা ৪৩ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা, জামুনা ব্যাংক ৭ দশমিক ২৭ শতাংশ বা ৩৮ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংক ৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ বা ৩৪ হাজার ১৯১ কোটি টাকা এবং মার্কেন্টাইল ব্যাংক ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ বা ৩০ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা লেনদেন করেছে।
জনতা ব্যাংকের অংশ ছিল ৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ বা প্রায় ২০ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। ব্যাংক এশিয়া ৩ দশমিক ১১ শতাংশ বা প্রায় ১৬ হাজার ৪১০ কোটি টাকা এবং কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ ২ দশমিক ৬৭ শতাংশ বা প্রায় ১৪ হাজার ৮৮ কোটি টাকা লেনদেন করেছে।
অতিরিক্ত তারল্যে কমছে বন্ডের সুদহার
এদিকে ব্যাংকিং খাতে বিপুল অতিরিক্ত তারল্যের প্রভাব পড়েছে সরকারি বন্ডের সুদহারেও। মঙ্গলবার ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ১০ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ৯ দশমিক ১২ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে ১৫ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ১০ দশমিক ৩৪ শতাংশ থেকে কমে ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ হয়েছে।
২০২৩ সালের মে মাসের পর এত কম পর্যায়ে বন্ডের সুদহার আর দেখা যায়নি। ওই সময় ২০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহার ছিল ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং ১৫ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহার ছিল ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ। সে সময় ব্যাংকের ঋণ বিতরণে ৯ শতাংশ সুদসীমা কার্যকর ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে অনেক ব্যাংকের হাতে বিপুল পরিমাণ অলস অর্থ রয়েছে। সেই অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ হিসেবে ব্যাংকগুলো সরকারি বন্ডে আগ্রহ দেখাচ্ছে। প্রত্যাশিত বন্ড বরাদ্দ পাওয়ার জন্য ব্যাংকগুলো তুলনামূলক কম সুদহারেও দরপ্রস্তাব করছে। এতে সরকারি বন্ডের সুদহার দ্রুত কমে এসেছে।
বাড়ছে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ
ব্যাংকগুলোর আধিপত্যের মধ্যেও সরকারি ঋণপত্রের বাজারে ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি ধীরে ধীরে বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুনে ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ডে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা সিকিউরিটিজের পরিমাণ ছিল মাত্র ১ হাজার ১০২ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে তা প্রায় চার গুণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮৫০ কোটি টাকায়।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা সরকারি সিকিউরিটিজের পরিমাণ আরও বেড়ে ৬ হাজার ৬২ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় পৌঁছে। ওই সময় এটি মোট বকেয়া সরকারি সিকিউরিটিজের ০ দশমিক ৮৩ শতাংশ ছিল।
২০২৬ সালের জুনে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ আরও বেড়ে ৭ হাজার ৪৬৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এটি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে মোট ৭ লাখ ৯৫ হাজার ৩৫৯ কোটি টাকার বকেয়া স্টকের ০ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
তবে মোট বাজারের তুলনায় ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের অংশ এখনো খুবই কম। তারপরও ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ বাড়ার প্রবণতা সরকারি ঋণপত্রকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ধীরে ধীরে একটি বিকল্প বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে পরিচিত করে তুলছে।
সরকারের ঋণগ্রহণে বাড়ছে বকেয়া সিকিউরিটিজ
এদিকে সরকারের ঋণগ্রহণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সরকারি সিকিউরিটিজের বাজারও দ্রুত বড় হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে সরকারের মোট বকেয়া সরকারি সিকিউরিটিজের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা।
এর তিন মাস আগে, মার্চ শেষে বকেয়া সরকারি সিকিউরিটিজের পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে বকেয়া সিকিউরিটিজ বেড়েছে ৬০ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে সরকার নিট ৬০ হাজার ২২৪ কোটি টাকার নতুন সরকারি সিকিউরিটিজ ইস্যু করেছে।
সরকারি ঋণপত্রের বাজারের এই সম্প্রসারণ একদিকে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে কয়েকটি বড় ব্যাংকের হাতে লেনদেনের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত হওয়ার বিষয়টিও সামনে আনছে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ বাড়তে থাকায় ভবিষ্যতে সরকারি সিকিউরিটিজের বাজারে বিনিয়োগকারীর ভিত্তি আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।












