ঢাকা || ০৫ এপ্রিল ২০২৬

কঠোর মুদ্রানীতি কাজ করছে না, রিজার্ভ মানি বৃদ্ধিতে বাড়ছে মূল্যস্ফীতির চাপ

কঠোর মুদ্রানীতি কাজ করছে না, রিজার্ভ মানি বৃদ্ধিতে বাড়ছে মূল্যস্ফীতির চাপ

ব্যাংক ইনফো

প্রকাশিত: ০০:১৬, ৬ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত কঠোর মুদ্রানীতি প্রত্যাশিতভাবে কাজ করছে না—এমন উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আর্থিকখাতের বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক একদিকে নীতিগতভাবে সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ব্যাংকগুলোতে উচ্চ পরিমাণে রিজার্ভ মানি প্রবাহিত হওয়ায় সেই প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রিজার্ভ মানি—যাকে ‘হাই-পাওয়ারড মানি’ও বলা হয়—হলো প্রচলিত নগদ অর্থ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জমার সমষ্টি। এটি পুরো মুদ্রা ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এবং ব্যাংকগুলোর ঋণ সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি।

রিজার্ভ মানির প্রবৃদ্ধি (শতকরা হার)
জুন ২০২৫: -০.১২%
জুলাই: ২.৫২%
আগস্ট: ১.২৫%
সেপ্টেম্বর: ৩.৪৭%
অক্টোবর: ৩.১৫%
নভেম্বর: ৪.৩৫%
ডিসেম্বর: ৯.২৩%
জানুয়ারি ২০২৬: ১০.৩৭%

দেখা যাচ্ছে, জুনে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি থেকে শুরু করে পরবর্তী মাসগুলোতে রিজার্ভ মানি দ্রুত বাড়তে থাকে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মিত তারল্য সরবরাহের পাশাপাশি ভর্তুকিযুক্ত (subsidised) ঋণ, বিশেষ ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলোকে কম সুদে অর্থ দেওয়া এবং ডলার ক্রয়ের মাধ্যমে বাজারে বিপুল পরিমাণ নতুন অর্থ প্রবেশ করছে। এটি সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

একজন কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ১০ শতাংশ নীতিসুদ  বজায় রাখা ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে ০.৫% থেকে ৫% সুদে বিভিন্ন স্কিমে ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেওয়া এখনো অব্যাহত রয়েছে।

এছাড়া সরকারের কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার নেওয়ার প্রবণতাও রিজার্ভ মানি বৃদ্ধির একটি বড় কারণ। ‘ওয়েজ অ্যান্ড মিনস’ এবং ওভারড্রাফট সুবিধার মাধ্যমে সরকার সর্বোচ্চ ১২০ বিলিয়ন টাকা পর্যন্ত ঋণ নিচ্ছে, যা বাজারে অতিরিক্ত তারল্য তৈরি করছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজেমেন্টের মহাপরিচালক ড. এজাজুল ইসলাম উল্লেখ করেন, বিদ্যুৎ উৎপাদক ও সার সরবরাহকারীদের বকেয়া পরিশোধে বিশেষ বন্ডের বিপরীতে ‘অ্যাসিউরড রেপো’ সুবিধার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে আরও অর্থ সরবরাহ করছে।

তিনি আরও জানান, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত জুলাইয়ের পর থেকে ৫৫০ কোটি ডলারের বেশি ক্রয় করেছে, যা বাজারে বিপুল পরিমাণ টাকা প্রবাহিত করেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি গত চার মাস ধরে ঊর্ধ্বমুখী ছিল—
নভেম্বর: ৮.২৯%
ডিসেম্বর: ৮.৪৯%
জানুয়ারি: ৮.৫৮%
ফেব্রুয়ারি: ৯.১৩%
তবে মার্চে তা কিছুটা কমে ৮.৭১% হয়েছে।

পলিসি একচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ মনে করেন, রিজার্ভ মানির এই প্রবৃদ্ধিই সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির একটি প্রধান কারণ। তার মতে, “এটি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি, কারণ এটি কঠোর মুদ্রানীতির লক্ষ্যকে দুর্বল করে দিচ্ছে।”

সামগ্রিকভাবে, বিশ্লেষকেরা বলছেন—মুদ্রানীতির ঘোষিত কঠোর অবস্থান বাস্তবে কার্যকর করতে হলে রিজার্ভ মানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। অন্যথায় মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকবে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমে যাবে।

city-bank
city-bank