পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল আমদানিতে জটিলতার মুখে পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। এতে সংস্থাটির নির্ধারিত ছয় মাসের আমদানি পরিকল্পনা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বিপিসি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী জুনের মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ টন অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির কথা ছিল। এর মধ্যে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব থেকে এবং বাকি ১৫ লাখ টন পরিশোধিত তেল ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানির কথা ছিল।
তবে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের ওপর হামলা এবং পরবর্তী পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হয়। এর প্রভাবে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
জানা গেছে, জানুয়ারিতে সৌদি আরব থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল সরবরাহ এলেও এরপর আর কোনো জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে পারেনি। মার্চে সৌদি আরব থেকে পাঠানো একটি জাহাজও হরমুজ প্রণালীতে বাধাগ্রস্ত হয়। বর্তমানে তা লোহিত সাগর হয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিপিসি জরুরি ভিত্তিতে মালয়েশিয়া থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ভারত থেকে ডিজেল আমদানি অব্যাহত রয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট জ্বালানি মজুত রয়েছে প্রায় ২ লাখ ৫৫ হাজার টন। এর মধ্যে ডিজেল ১ লাখ ২২ হাজার টন, অকটেন ৯ হাজার টন, পেট্রোল ১২ হাজার টন, ফার্নেস অয়েল ৫৮ হাজার টন, জেট ফুয়েল ৪১ হাজার টনসহ অন্যান্য জ্বালানি রয়েছে। এছাড়া জরুরি প্রয়োজনে আরও প্রায় ৮০ হাজার টন জ্বালানি মজুত রাখা হয়েছে।
তবে বর্তমান মজুত ও আমদানি মিলিয়ে প্রায় ৪ লাখ টন জ্বালানি পাওয়া গেলেও মাসিক গড় চাহিদা ৫ লাখ টনের বেশি হওয়ায় ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘ সারি, রেশনিং এবং ভোক্তাদের ভোগান্তি দেখা দিয়েছে।
সরকার যদিও জ্বালানি সংকটের বিষয়টি অস্বীকার করছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, “দেশে জ্বালানি সংকট নেই।” তিনি আরও জানান, বিকল্প উৎস হিসেবে নাইজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, ব্রুনেই, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া ও কাজাখস্তান থেকে আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী প্রায় ২ হাজার জাহাজ বিভিন্ন সাগরে আটকা পড়েছে বলে জানা গেছে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও প্রভাব পড়ছে।
চলতি মাসে চট্টগ্রাম বন্দরে অন্তত ১৫টি জাহাজ ভিড়ার আশা করছে বিপিসি। ইতোমধ্যে মালয়েশিয়া থেকে ২৭ হাজার ৩০০ টন ডিজেলবাহী একটি জাহাজ পণ্য খালাস শুরু করেছে। এছাড়া সিঙ্গাপুর ও অন্যান্য দেশ থেকে আরও জাহাজ আসার কথা রয়েছে।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ৬২.১৫ লাখ টন জ্বালানি আমদানি করা হয়েছে, যার ব্যয় ছিল প্রায় ৫০ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি সরবরাহে আরও চাপ তৈরি হতে পারে, যা দেশের পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।











