ঢাকা || ০৭ জুন ২০২৬

তিনমাসে ৪৪ ব্যাংকে বেড়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ

তিনমাসে ৪৪ ব্যাংকে বেড়েছে ৩১ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ

ব্যাংক ইনফো

প্রকাশিত: ১৩:৪২, ৭ জুন ২০২৬

খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে বাংলাদেশ ব্যাংকের একের পর এক নীতিগত ছাড় ও পুনঃতফসিল সুবিধা সত্ত্বেও দেশের ব্যাংক খাতে ঋণখেলাপির পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মধ্যে ৪৪টিতেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে, যা ব্যাংক খাতের জন্য এক উদ্বেগজনক রেকর্ড।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র তিন মাসে এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। ফলে মার্চ শেষে ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায়, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডিসেম্বর প্রান্তিকে অনেক ব্যাংক প্রকৃত খেলাপি ঋণের তথ্য গোপন করেছিল। পরবর্তী পরিদর্শনে এসব গোপন তথ্য উন্মোচিত হওয়ায় খেলাপি ঋণের হিসাব সংশোধন করতে হয়েছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও ব্যবসায়িক মন্দার কারণে ঋণ আদায়ও দুর্বল হয়ে পড়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে পরিস্থিতি আরও নাজুক:

ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মধ্যে চারটির খেলাপি ঋণ বেড়েছে। মার্চ শেষে এসব ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ।

সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ বেড়েছে জনতা ব্যাংকে। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ২ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা বেড়ে ৭৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা তাদের মোট ঋণের প্রায় ৭৪ শতাংশ। এছাড়া রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬৮৮ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের ২৮৪ কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংকের ১১ কোটি টাকা।

বেসরকারি ব্যাংকেই সবচেয়ে বড় ধাক্কা;

৪৩টি বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে ৩৪টির খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এ খাতে মোট খেলাপি ঋণ ২৬ হাজার ৯০৩ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকায়, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ১১ শতাংশ।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে আইএফআইসি ব্যাংক। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ৪ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা থেকে এক লাফে ২৮ হাজার ১৭৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা তাদের মোট ঋণের ৬৩ শতাংশ।

এছাড়া ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংকে ৩ হাজার ৩২০ কোটি টাকা, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকে ২ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকে ২ হাজার ১৬২ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকে ১ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা এবং এবি ব্যাংকে ১ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা।

একসময় তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হিসেবে বিবেচিত কয়েকটি ব্যাংকেও খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এর মধ্যে সিটি ব্যাংকে ৪২২ কোটি টাকা, ব্যাংক এশিয়ায় ৬৬২ কোটি টাকা, উত্তরা ব্যাংকে ৪০৬ কোটি টাকা, প্রাইম ব্যাংকে ৩৯২ কোটি টাকা এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশে ২১৬ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এছাড়া আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক ও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকেও খেলাপি ঋণ বেড়েছে।

বিশেষায়িত ও বিদেশি ব্যাংকও চাপে:

বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মধ্যেও ঋণখেলাপি বেড়েছে। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩৯৬ কোটি টাকা, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ১৯৯ কোটি টাকা এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ৩৪ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

অন্যদিকে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে এইচএসবিসি বাংলাদেশ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ এবং স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়াতেও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির তথ্য পাওয়া গেছে।

কেন বাড়ছে খেলাপি ঋণ:

ব্যাংকারদের মতে, অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের সুদহার বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর নগদ প্রবাহ সংকুচিত করেছে। ফলে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, অর্থনৈতিক স্থবিরতা ব্যবসা সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং অনেক বড় ঋণগ্রহীতা এখনো নীতিগত সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।

এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তৌহিদুল আলম খান খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে পাঁচটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আগে গোপন রাখা খেলাপি ঋণ এখন কঠোর নজরদারির কারণে প্রকাশ পাচ্ছে। পাশাপাশি ঋণ স্থগিত ও বিশেষ ছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়ায় অনেক হিসাব পুনরায় খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকরণ করা হয়েছে।

তার মতে, দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন ব্যবস্থা, জামানতের অতিমূল্যায়ন এবং ঋণ প্রদানে রাজনৈতিক প্রভাবও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফলে প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, কার্যকর সংস্কার ও কঠোর আদায় ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে খেলাপি ঋণের বোঝা আগামী প্রান্তিকগুলোতে আরও বাড়তে পারে, যা সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে।
 

city-bank
city-bank