ঢাকা || ২৪ জুলাই ২০২৬

খেলাপি ঋণে এগিয়ে চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংক, বিতরণ করা ঋণের অর্ধেকের বেশি অনাদায়ী

খেলাপি ঋণে এগিয়ে চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংক, বিতরণ করা ঋণের অর্ধেকের বেশি অনাদায়ী

ব্যাংক ইনফো

প্রকাশিত: ১২:১৫, ২৪ জুলাই ২০২৬

দেশের চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলতি বছরের মার্চ শেষে এ শ্রেণির ৯টি ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ৫২ দশমিক ২০ শতাংশই খেলাপি হয়ে গেছে। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ টাকা ঋণের বিপরীতে ৫২ টাকার বেশি অনাদায়ী রয়েছে। একই সময়ে দেশের সামগ্রিক ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আলোচ্য ব্যাংকগুলো হলো—মধুমতি, মিডল্যান্ড, ইউনিয়ন, সাউথ বাংলা অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স (এসবিএসি), মেঘনা, পদ্মা, এনআরবি, গ্লোবাল ইসলামী এবং এনআরবি কমার্শিয়াল (এনআরবিসি) ব্যাংক।

খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, পরিচালনা পর্ষদের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ, ঝুঁকি মূল্যায়নে ঘাটতি, স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে ঋণ বিতরণ এবং কার্যকর তদারকির অভাব—এসব কারণে এ শ্রেণির কয়েকটি ব্যাংকে খেলাপি ঋণ দ্রুত বেড়েছে। এছাড়া অতীতে পুনঃতফসিল ও বিভিন্ন বিশেষ সুবিধার কারণে প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্রও অনেক ক্ষেত্রে আড়ালে ছিল বলে মনে করছেন তারা।

ব্যাংকভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণের হার রয়েছে ইউনিয়ন ব্যাংকে, যা ৯৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এরপর রয়েছে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক (৯৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ), পদ্মা ব্যাংক (৯০ দশমিক ৬৮ শতাংশ), এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক (২২ দশমিক ৪৮ শতাংশ), এসবিএসি ব্যাংক (১৮ দশমিক ৬১ শতাংশ), মিডল্যান্ড ব্যাংক (৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ) এবং মধুমতি ব্যাংক (২ দশমিক ৮২ শতাংশ)।

এক বছরের ব্যবধানে চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার আরও বেড়েছে। ২০২৫ সালের মার্চ শেষে যেখানে এ হার ছিল ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ, ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে হয় ৫১ দশমিক ১ শতাংশ। চলতি বছরের মার্চ শেষে তা আরও বেড়ে ৫২ দশমিক ২০ শতাংশে পৌঁছেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনায় আরও দেখা গেছে, এ শ্রেণির কয়েকটি ব্যাংকের **অ্যাডভান্স-টু-ডিপোজিট রেশিও (এডিআর)** এখনো ১০০ শতাংশের বেশি। মার্চ শেষে চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর গড় এডিআর ছিল ১০১ দশমিক ৬ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের উচ্চ এডিআর ব্যাংকের তারল্য ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

প্রজন্মভিত্তিক তুলনায় প্রথম প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ৩৪ দশমিক ৪০ শতাংশ, তৃতীয় প্রজন্মের ব্যাংকে ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ, দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্যাংকে ১৯ দশমিক ২০ শতাংশ এবং পঞ্চম প্রজন্মের ব্যাংকে ৫ শতাংশ।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যবসা-বাণিজ্য খাতে খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি, ৪৩ দশমিক ৮০ শতাংশ। শিল্প খাতে এ হার ৩১ দশমিক ৯০ শতাংশ, নির্মাণ খাতে ২৯ দশমিক ৯০ শতাংশ, কৃষি, মৎস্য ও বনায়ন খাতে ২৯ দশমিক ৯০ শতাংশ, পরিবহন খাতে ২৫ দশমিক ৭০ শতাংশ, অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক ঋণে ১৫ শতাংশ এবং ভোক্তা ঋণে ৭ দশমিক ১০ শতাংশ।

ঋণের আকার অনুযায়ী বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণে খেলাপির হার ১৫ শতাংশ। এক কোটি এক টাকা থেকে ১০ কোটি টাকার ঋণে এ হার ২৬ দশমিক ৬০ শতাংশ। ১০ কোটি এক টাকা থেকে ২০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপির হার সবচেয়ে বেশি, ৪৫ দশমিক ১০ শতাংশ। এছাড়া ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপির হার ৩৫ দশমিক ৭০ শতাংশ, ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকায় ৩৮ দশমিক ৯০ শতাংশ, ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকায় ৪৪ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণে এ হার ৪২ দশমিক ৫০ শতাংশ।

ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ঋণ পুনরুদ্ধার, ঝুঁকিভিত্তিক ঋণ মূল্যায়ন, শক্তিশালী করপোরেট সুশাসন এবং তদারকি জোরদার করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।