ঢাকা || ২৪ জুলাই ২০২৬

অন্তর্ভুক্তিমূলক তাৎক্ষণিক পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর, কমবে হুন্ডি নির্ভরতা

অন্তর্ভুক্তিমূলক তাৎক্ষণিক পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর, কমবে হুন্ডি নির্ভরতা

ব্যাংক ইনফো

প্রকাশিত: ১২:০০, ২৪ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক তাৎক্ষণিক পেমেন্ট সিস্টেম (আইআইপিএস) চালু করা গেলে রেমিট্যান্সের খরচ কমবে, আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে অর্থ পাঠানো বাড়বে এবং হুন্ডির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা।

বৃহস্পতিবার পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) গেটস ফাউন্ডেশনের সহায়তায়  বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক তাৎক্ষণিক পেমেন্ট সিস্টেম (আইআইপিএস) বিশ্লেষণ এবং একটি ব্যবহারিক ক্ষেত্র হিসেবে আন্তঃসীমান্ত রেমিট্যান্স’ শীর্ষক প্রকল্পের উদ্বোধনী কর্মশালায় এ মত তুলে ধরা হয়। কর্মশালায় বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক খাত, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, বর্তমানে রেমিট্যান্স বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৬ শতাংশের সমান। এই অর্থ শুধু ভোগব্যয়ে নয়, উৎপাদনশীল বিনিয়োগে ব্যবহারের জন্য কার্যকর নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি বলেন, ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থায় এখনও বৈষম্য রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ওমানে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি এখনও আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে হুন্ডির মাধ্যমে দেশে অর্থ পাঠান।

কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআইয়ের গবেষণা পরিচালক ড. বজলুল হক খন্দকার এবং পরিচালক ড. এম. এ. রাজ্জাক।

ড. বজলুল হক খন্দকার বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক তাৎক্ষণিক পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু হলে ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও অন্যান্য পেমেন্ট সেবাদাতার মধ্যে আন্তঃপরিচালনযোগ্য (ইন্টারঅপারেবল) ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে উঠবে। এর ফলে লেনদেন হবে দ্রুত, কম খরচে এবং আরও সহজলভ্য। বিশেষ করে আন্তঃসীমান্ত রেমিট্যান্সে তাৎক্ষণিক ও স্বল্প ব্যয়ের পেমেন্ট করিডর তৈরি হলে অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের ব্যবহার কমবে এবং প্রবাসীদের ব্যয়ও হ্রাস পাবে।

তিনি জানান, গবেষণায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বাংলাদেশের পেমেন্ট অবকাঠামো, বাজারের প্রণোদনা, নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং ব্যবহারকারীর আচরণ বিশ্লেষণ করা হবে। গবেষণার ভিত্তিতে যৌথ ও কম ব্যয়ের ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তোলার নীতিসুপারিশ প্রণয়ন করা হবে।

ড. এম. এ. রাজ্জাক বলেন, রেমিট্যান্সকে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে আনতে পারলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়বে, পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা শক্তিশালী হবে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও উপকৃত হবে। তিনি জানান, ছয়টি প্রধান অভিবাসী গন্তব্যে বাংলাদেশিদের ওপর জরিপ চালিয়ে তারা কেন আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক চ্যানেল বেছে নেন—তা বিশ্লেষণ করা হবে। এতে লেনদেন ব্যয়, বিনিময় হার, গতি, আস্থা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং প্রাপকের সেবা পাওয়ার সুযোগের মতো বিষয়গুলো মূল্যায়ন করা হবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. এজাজুল ইসলাম বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক তাৎক্ষণিক পেমেন্ট ব্যবস্থা ডিজিটাল লেনদেনের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, প্রতিযোগিতা এবং পেমেন্ট ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়াবে। একই সঙ্গে এটি আনুষ্ঠানিক আর্থিক চ্যানেলের ব্যবহার, কর পরিপালন এবং অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখবে।

তিনি আরও বলেন, আইআইপিএসের দীর্ঘমেয়াদি সফলতা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী সুশাসন, কার্যকর বাণিজ্যিক প্রণোদনা, টেকসই মূল্য নির্ধারণ, বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং নির্ভরযোগ্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি।

প্যানেল আলোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ জাহিদ ইকবাল জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক উন্মুক্ত উৎসভিত্তিক **মোজালুপ (Mojaloop)** প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আইআইপিএস উন্নয়ন করছে। এর মাধ্যমে ব্যাংক, পেমেন্ট সেবাদাতা এবং ভবিষ্যতে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই ডিজিটাল অবকাঠামোর আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের নভেম্বরে চালু হওয়া এ ব্যবস্থায় ফিচার ফোনের মাধ্যমে সেবা, সহজ হিসাব খোলা, ব্যর্থ লেনদেন কমানো এবং তাজামা টুলকিটের মাধ্যমে জালিয়াতি প্রতিরোধের সুবিধা থাকবে।

বিকাশ লিমিটেডের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ শেখ ইবনে জিলানী বলেন, আন্তঃপরিচালনযোগ্য ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতের প্ল্যাটফর্মগুলোকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে ভোক্তা সুরক্ষা, সাশ্রয়ী লেনদেন ব্যয় এবং ব্যবহারকারীর আস্থা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সমাপনী বক্তব্যে পিআরআইয়ের সম্মাননীয় ফেলো ড. আহসান এইচ. মনসুর বলেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, তাৎক্ষণিক পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং নগদবিহীন অর্থনীতিতে উত্তরণকে সমন্বিত জাতীয় কৌশল হিসেবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি জানান, নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয় এবং এ ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে।

তিনি বলেন, ডিজিটাল লেনদেনের খরচ কমাতে প্রয়োজনে সাময়িক প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য লাভজনক হবে। পাশাপাশি স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সেবা আরও সাশ্রয়ী করতে হবে, যাতে ডিজিটাল বৈষম্য কমে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ে।

ড. মনসুর আরও বলেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ বিনিয়োগ সুবিধা তৈরি করা গেলে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে অতিরিক্ত ২০০ থেকে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ দেশে আনার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।