ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত উৎপাদন ও ভ্যাট রিটার্নে দেওয়া তথ্যের মধ্যে কোনো গরমিল আছে কি না, তা যাচাইয়ে মাঠে নেমেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভ্যাট বিভাগ। এ লক্ষ্যে দেশের শীর্ষ ১৭টি ওষুধ কোম্পানির গত পাঁচ অর্থবছরের পণ্যভিত্তিক উৎপাদন তথ্য চেয়ে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে (ডিজিডিএ) চিঠি দিয়েছে ভ্যাট বিভাগের বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)।
রাজস্ব কর্মকর্তারা বলছেন, উৎপাদনের প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে ভ্যাট রিটার্ন মিলিয়ে দেখার মাধ্যমে ঘোষণায় কোনো অসঙ্গতি রয়েছে কি না, তা শনাক্ত করা হবে। এতে ভ্যাট পরিপালন (কমপ্লায়েন্স) বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আহরণও জোরদার হবে বলে তাদের আশা।
এলটিইউ সূত্রে জানা গেছে, ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ৮২ ধারার আওতায় ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে শুরু করে সর্বশেষ পাঁচ বছরের উৎপাদন তথ্য চাওয়া হয়েছে। বিদ্যমান বিধি অনুযায়ী ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎপাদনসংক্রান্ত প্রতিবেদন নিয়মিতভাবে ডিজিডিএতে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই তথ্যই এখন এনবিআর ভ্যাট রিটার্নের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চায়।
এ বিষয়ে এলটিইউ কমিশনার সৈয়দ আতীকুর রহমান বলেন, ভ্যাট পরিশোধ পর্যবেক্ষণ ও আইনানুগ পরিপালন নিশ্চিত করার দায়িত্বের অংশ হিসেবেই ডিজিডিএর কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে। আইন অনুযায়ী সরকারি সংস্থাগুলোর প্রয়োজনীয় তথ্য বিনিময়ে সহযোগিতা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
জানা গেছে, গত ১২ মে ডিজিডিএকে চিঠি পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। এ কারণে এনবিআরের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, ডিজিডিএ উৎপাদনসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিতভাবে সংরক্ষণ করছে কি না কিংবা এমন কোনো ডেটাবেজ রয়েছে কি না, যেখান থেকে সহজেই তথ্য সরবরাহ করা সম্ভব।
এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, দুটি সম্ভাবনা রয়েছে—হয় সব প্রতিষ্ঠান নিয়মিত উৎপাদন প্রতিবেদন জমা দিচ্ছে না, অথবা ডিজিডিএ তথ্যগুলো এমনভাবে সংরক্ষণ করছে না, যা অন্য সরকারি সংস্থার সঙ্গে সহজে ভাগাভাগি করা যায়। তাদের মতে, উৎপাদন প্রতিবেদন সংক্রান্ত বিধান কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে ওষুধ খাতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং ভ্যাট ফাঁকির সুযোগও কমবে।
অন্যদিকে, ডিজিডিএর পরিচালক ডা. মো. আখতার হোসেন বলেন, এলটিইউর অনুরোধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালা পর্যালোচনা করা হবে। ডিজিডিএর ওপর এ ধরনের তথ্য সংরক্ষণ বা চাহিদামতো সরবরাহের বাধ্যবাধকতা রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের পরই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তবে শিল্পসংশ্লিষ্টরা এনবিআরের এই উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএপিআই) মহাসচিব মোহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, অধিকাংশ ওষুধ কোম্পানি বছরে একবার ডিজিডিএতে উৎপাদন তথ্য জমা দেয়। প্রতি তিন মাস অন্তর একই ধরনের প্রতিবেদন তৈরি করা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রশাসনিকভাবে জটিল।
তার মতে, ব্যবসা সহজীকরণের কথা বলা হলেও বাস্তবে একই তথ্য বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় বারবার জমা দিতে হচ্ছে। এছাড়া ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন), ভ্যাট রিটার্ন, কাঁচামাল আমদানির তথ্যসহ ওষুধ কোম্পানিগুলোর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ইতোমধ্যেই এনবিআরের কাছে রয়েছে। ফলে আলাদা উৎপাদন প্রতিবেদন ব্যবস্থার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তবে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স পরিচালক ও নির্বাহী পরিচালক (ফাইন্যান্স অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস) নাইমুল হুদা বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে ডিজিডিএতে উৎপাদন তথ্য জমা দেয়। কারণ ওষুধের কাঁচামাল আমদানির অনুমোদন পেতে এটি একটি বাধ্যতামূলক শর্ত।
এলটিইউ যে ১৭টি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন তথ্য চেয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস, রেনাটা, এসকেএফ, অ্যারিস্টোফার্মা, এসিআই, এসিএমই, এসেনশিয়াল ড্রাগস, ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল, জেনারেল ফার্মাসিউটিক্যালস, নাভানা ফার্মাসিউটিক্যালস, নুভিস্তা ফার্মা, ওরিয়ন ফার্মা, প্যাসিফিক ফার্মাসিউটিক্যালস, সিনোভিয়া ফার্মা এবং ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি।
রাজস্ব কর্মকর্তাদের মতে, ডিজিডিএর সংরক্ষিত উৎপাদন তথ্য ও এনবিআরের ভ্যাট রেকর্ড সমন্বয় করা গেলে প্রকৃত উৎপাদন এবং ঘোষিত ভ্যাটের মধ্যে পার্থক্য সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে দ্রুত সম্প্রসারণশীল ওষুধ শিল্পে স্বচ্ছতা বাড়ার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আহরণও আরও কার্যকর হবে।















