ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের পরপর তিনটি সভায় চেয়ারম্যান আলহাজ মোহাম্মদ সাঈদ খোকনসহ পাঁচ পরিচালকের অনুপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ধারা ১০৮ অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়া পরপর তিনটি বোর্ড সভায় অনুপস্থিত থাকলে পরিচালকের পদ শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। অথচ বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তদন্ত এবং তাদের নিয়োগ করা নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মাহফেল হক অ্যান্ড কোম্পানির প্রতিবেদনে চেয়ারম্যান ছাড়া অন্য চার পরিচালকের অনুপস্থিতির তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডির অনুসন্ধানে ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের ২৪৬তম, ২৪৭তম ও ২৪৮তম বোর্ড সভার কার্যবিবরণী ও হাজিরা শিট পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল থেকে ১৪ আগস্টের মধ্যে অনুষ্ঠিত ওই তিন সভায় চেয়ারম্যান সাঈদ খোকনের পাশাপাশি পরিচালক আয়েশা নিভ্রাস সাঈদ, ফাতিমা নশিন মায়শা সাঈদ অরোরা ও রিফা নানজিবা সাঈদ উপস্থিত ছিলেন না বলে নথিপত্রে দেখা গেছে। এ তিনজন চেয়ারম্যান সাঈদ খোকনের মেয়ে। অন্যদিকে পরিচালক মাহমুদা নাসিমও ওই ধারাবাহিক সভাগুলোতে উপস্থিত থাকার বিষয়ে প্রশ্ন তৈরি করে এমন অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।
চেয়ারম্যান সাঈদ খোকনের অনুপস্থিতির বিষয়টি আইডিআরএর তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এলেও তাঁর অনুপস্থিতি বোর্ড অনুমোদন করেছিল কি না, সে বিষয়ে তদন্ত দল কোনো মতামত দেয়নি। ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট গঠিত দুই সদস্যের তদন্ত কমিটি ১৭ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমা দেয়।
পরে আইডিআরএর নিয়োগ করা নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মাহফেল হক অ্যান্ড কোম্পানি চলতি বছরের ১৫ মার্চ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সাঈদ খোকন পরপর তিনটি বোর্ড সভায় অনুমোদন ছাড়া অনুপস্থিত ছিলেন এবং এসব সভায় তাঁর ছুটি মঞ্জুর করা হয়নি।
কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ধারা ১০৮(১)(চ) অনুযায়ী পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়া পরপর তিনটি বোর্ড সভায় অনুপস্থিত থাকার ক্ষেত্রে পরিচালকের পদ শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশনের ৯০(৬) অনুচ্ছেদেও এ বিষয়ে বিধান রয়েছে। ফলে সাঈদ খোকনের পরিচালক পদ ও চেয়ারম্যান পদ বহাল থাকার বৈধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
চার পরিচালকের অনুপস্থিতি তদন্তে নেই
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, চেয়ারম্যানের তিন মেয়ে—শেয়ারহোল্ডার পরিচালক আয়েশা নিভ্রাস সাঈদ, ফাতিমা নশিন মায়শা সাঈদ অরোরা ও রিফা নানজিবা সাঈদ—২৪৬তম থেকে ২৪৮তম তিনটি সভায় উপস্থিত ছিলেন না। এ ছাড়া পরিচালক মাহমুদা নাসিমও পরপর কয়েকটি সভায় উপস্থিত থাকার বিষয়ে নথিতে অসঙ্গতি রয়েছে। তাদের অনুপস্থিতির অনুমোদন ছিল কি না, তারও কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিশেষ করে ২৪৬ ও ২৪৭তম সভার কার্যবিবরণীতে মাহমুদা নাসিমকে উপস্থিত দেখানো হলেও সংশ্লিষ্ট হাজিরা শিটে তাঁর নামের পাশে স্বাক্ষর করেছেন কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান ও তাঁর স্বামী নুর মোহাম্মদ। আবার ২৪৮তম সভার হাজিরা শিটে থাকা স্বাক্ষরটির সঙ্গে অন্যান্য সভায় মাহমুদা নাসিমের দেওয়া স্বাক্ষরের মিল পাওয়া যায়নি বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে।
আইডিআরএর তদন্ত প্রতিবেদনে এ ঘটনাকে ‘প্রক্সি’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও একজন পরিচালকের পরিবর্তে অন্যজনের স্বাক্ষর দেওয়ার আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট নথি ও প্রযোজ্য আইনের আলোকে আরও যাচাই প্রয়োজন।
ছয় উদ্যোক্তা পরিচালকের অভিযোগ
ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের পরিচালনা পর্ষদের গঠন ও বোর্ড সভা নিয়ে ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ছয় সাবেক উদ্যোক্তা পরিচালক আইডিআরএর কাছে অভিযোগ করেন। অভিযোগে সাঈদ খোকনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চেয়ারম্যান পদে থাকা, উদ্যোক্তা পরিচালকদের বাদ দেওয়া এবং পরিবারের সদস্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচালক করার মতো বিভিন্ন অনিয়মের দাবি করা হয়।
অভিযোগের পর আইডিআরএ তদন্ত কমিটি গঠন করে। পরে বিষয়টি নিয়ে আরও তদন্ত ও পুনর্তদন্ত হয়েছে।
এর মধ্যে কোম্পানিটির পরিচালকদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও করপোরেট সুশাসন লঙ্ঘনের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে আইডিআরএকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। কোম্পানি আইনের ২৩৩ ধারায় করা এক আবেদনের শুনানি শেষে গত ৯ জুলাই আদালত আগামী ২৬ অক্টোবরের মধ্যে বিষয়টি নিষ্পত্তি করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের তথ্য থেকে জানা গেছে।
আদালতে বিচারাধীন, তাই মন্তব্য নয়
পর্ষদ সভা ও পরিচালক পদসংক্রান্ত বিষয়ে ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের বক্তব্য জানতে চাইলে কোম্পানির সেক্রেটারি চৌধুরী এহসানুল হক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানানো হয়, এসব বিষয় বিভিন্ন সংস্থায় তদন্তাধীন ও পুনর্তদন্তাধীন। একই সঙ্গে বিষয়গুলো নিয়ে আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকায় এ মুহূর্তে কোনো মতামত দেওয়া সমীচীন হবে না।
অন্যদিকে আইডিআরএর মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশের পর্ষদ সভা ও পরিচালক পদসংক্রান্ত বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
ফলে এখন মূল প্রশ্ন হলো—পরপর তিনটি বোর্ড সভায় অনুমোদন ছাড়া অনুপস্থিত থাকার ক্ষেত্রে কোম্পানি আইনের বিধান কার কার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে এবং বোর্ডের হাজিরা-সংক্রান্ত অসঙ্গতিগুলো নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয়। বিষয়টি আদালতের নির্দেশের পাশাপাশি আইডিআরএর চলমান কার্যক্রমের ফলাফলের ওপরও নির্ভর করছে।














