ঢাকা || ২২ আগস্ট ২০২৬

‘মাসরুর’ কে—পরীমণি বিতর্কে পুরোনো নাম-বিভ্রান্তি ফের আলোচনায়

‘মাসরুর’ কে—পরীমণি বিতর্কে পুরোনো নাম-বিভ্রান্তি ফের আলোচনায়

ব্যাংক ইনফো

প্রকাশিত: ২০:২৬, ২২ আগস্ট ২০২৬

চিত্রনায়িকা তমা মির্জার এবি ব্যাংকে যোগদান ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাংক ও বিনোদনজগতের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সেই আলোচনার সূত্র ধরে ২০২১ সালের বহুল আলোচিত পরীমণি–মাসরুর বিতর্কও আবার সামনে এসেছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, পরীমণিকে বিলাসবহুল গাড়ি উপহার দেওয়ার অভিযোগে আলোচিত ‘মাসরুর’ আসলে কে ছিলেন।

২০২১ সালের আগস্টে প্রকাশিত এক সংবাদে সিটি ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিনের নাম পরীমণিকে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা দামের মাসেরাতি গাড়ি উপহার দেওয়ার অভিযোগের সঙ্গে জড়ানো হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে পরীমণির সঙ্গে একটি বেসরকারি ব্যাংকের এমডি ‘মাসরুর আরেফিন’-এর কথিত অডিও রেকর্ডে গাড়ি উপহারের প্রসঙ্গ থাকার দাবি করা হয়। একই প্রতিবেদনে ‘শওকত রুবেল’ নামে ওই ব্যাংকের চেয়ারম্যানের সঙ্গে পরীমণির ঘনিষ্ঠতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল।

তবে প্রকাশের পরপরই অভিযোগটি সরাসরি অস্বীকার করেন মাসরুর আরেফিন। ২০২১ সালের ৯ আগস্ট দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, তিনি পরীমণি নামের কাউকে কখনো দেখেননি এবং তাঁর সঙ্গে কোনো পরিচয় বা যোগাযোগ নেই। এমনকি পরীমণির ফোন নম্বর তাঁর কাছে থাকার প্রশ্নও নেই বলে জানান তিনি।

মাসরুর আরেফিন তখন সংবাদে ব্যবহৃত ‘শওকত রুবেল’ নাম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে ওই নামে কেউ নেই। তিনি ধারণা করেছিলেন, ব্যবসায়ী শওকত আজিজ রাসেলের নামের সঙ্গে ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট পরিচয় গুলিয়ে ফেলা হয়ে থাকতে পারে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, তাঁকে এবং এক অর্থে সিটি ব্যাংককে একটি ‘সস্তা’ ষড়যন্ত্রের মধ্যে টেনে আনা হয়েছে।

পরে স্পষ্ট হয়, নামটি ভুল ছিল
পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত সংশোধনীতে সংবাদমাধ্যমটি স্বীকার করে যে পরীমণি-সংক্রান্ত ওই প্রতিবেদনে মাসরুর আরেফিনের নাম ভুলভাবে প্রকাশিত হয়েছিল এবং সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যানের নামও ভুল ছিল। সংশোধনীতে বলা হয়, পরীমণির ঘটনার সঙ্গে মাসরুর আরেফিনের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না এবং তাঁর নাম ভুলভাবে প্রকাশিত হওয়ায় তাঁর ব্যক্তিমর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে।

ফলে ২০২১ সালের বিতর্কে মাসরুর আরেফিনের নাম আসার বিষয়টি এখন আর নিছক অভিযোগের জায়গায় নেই; বরং এটি একটি স্বীকৃত সংবাদগত ভুলের উদাহরণ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। ওই সময়ের বিভিন্ন প্রতিবেদনে মাসরুর আরেফিনের প্রতিবাদ এবং তাঁর অবস্থানও বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়েছিল।

তাহলে আলোচিত ‘মাসরুর’ কে?
সাম্প্রতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় দাবি করা হচ্ছে, পরীমণির গাড়ি বিতর্কে তৎকালীন ডিবি কর্মকর্তা হারুনের বক্তব্যে যে ‘মাসরুর’-এর কথা উঠেছিল, তিনি সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিন নন; বরং খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত এসব বক্তব্যে মিতুকে সাবেক মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছেলে এবং সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সাবেক স্বামী হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

তবে এই দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রামাণ্য নথি বা নির্ভরযোগ্য প্রত্যক্ষ সূত্র এই প্রতিবেদনের হাতে নেই। ফলে ‘মাসরুর’ বলতে খন্দকার মাসরুর হোসেন মিতুকেই বোঝানো হয়েছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এই মুহূর্তে সতর্কতার বাইরে হবে।

হারুনের বক্তব্য ঘিরেও প্রশ্ন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বয়ানে দাবি করা হচ্ছে, বোট ক্লাবের ঘটনার পর পরীমণিকে দামি গাড়ি উপহার দেওয়ার প্রসঙ্গে তৎকালীন ডিবি কর্মকর্তা হারুনুর রশীদের বক্তব্যে ‘মাসরুর’ নামটি উঠে এসেছিল। পরে সেই নামের সূত্র ধরে সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিনের নাম আলোচনায় আসে।

এ দাবির সঙ্গে আরও বলা হচ্ছে, তৎকালীন সিটি ব্যাংক চেয়ারম্যানের ভাই ব্যবসায়ী শওকত আজিজ রাসেলের সঙ্গে হারুনের বিরোধের প্রেক্ষাপটে মাসরুর আরেফিনকে বিতর্কে জড়ানো হয়ে থাকতে পারে। তবে এটিও বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত একটি ব্যাখ্যা; এর পক্ষে স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

পরীমণির গাড়ি বিতর্কে যে বিষয়টি নিশ্চিত
পুরোনো নথি ও সংবাদ প্রতিবেদন থেকে অন্তত তিনটি বিষয় স্পষ্ট।

প্রথমত, ২০২১ সালে পরীমণিকে মাসেরাতি গাড়ি উপহার দেওয়ার অভিযোগের সঙ্গে মাসরুর আরেফিনের নাম প্রকাশ্যে আসে। দ্বিতীয়ত, মাসরুর আরেফিন তা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেন এবং পরীমণির সঙ্গে তাঁর কোনো পরিচয় বা যোগাযোগ নেই বলে জানান। তৃতীয়ত, ওই প্রতিবেদনে তাঁর নাম এবং সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যানের নাম ভুলভাবে প্রকাশিত হয়েছিল বলে পরবর্তী সময়ে সংশোধনী দেওয়া হয়।

অর্থাৎ, পরীমণিকে গাড়ি উপহারের অভিযোগের সঙ্গে সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিনকে জড়ানোর বিষয়টি প্রমাণিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। বরং বিদ্যমান প্রকাশ্য রেকর্ডে তাঁর অবস্থান হলো—তিনি অভিযোগটি অস্বীকার করেছেন এবং তাঁর নাম ভুলভাবে প্রকাশিত হয়েছিল।

নতুন আলোচনায় পুরোনো বিতর্ক
তমা মির্জার এবি ব্যাংকে যোগদানের ঘটনা ঘিরে ব্যাংক ও বিনোদনজগতের সম্পর্ক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে, তারই ধারাবাহিকতায় পুরোনো পরীমণি বিতর্কও সামনে এসেছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নতুন দাবির সঙ্গে ২০২১ সালের যাচাইযোগ্য সংবাদ-রেকর্ডকে আলাদা করে দেখা জরুরি।

বিশেষ করে ‘মাসরুর’ নামটি নিয়ে বিভ্রান্তির ক্ষেত্রে সিটি ব্যাংকের এমডি মাসরুর আরেফিনের নাম এবং অন্য কোনো ব্যক্তির পরিচয় এক করে দেখা হলে আবারও একই ধরনের ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাই পরীমণি-সংক্রান্ত পুরোনো গাড়ি বিতর্কে নতুন করে কোনো ব্যক্তির নাম জড়ানোর আগে সংশ্লিষ্ট নথি, প্রত্যক্ষ বক্তব্য ও স্বাধীন সূত্র দিয়ে তা যাচাই করা জরুরি। বর্তমানে প্রকাশ্য রেকর্ডে মাসরুর আরেফিনের বিরুদ্ধে গাড়ি উপহারের অভিযোগের সমর্থনে নির্ভরযোগ্য প্রমাণের চেয়ে তাঁর প্রকাশ্য অস্বীকৃতি এবং পরবর্তী সংবাদ-সংশোধনের তথ্যই বেশি স্পষ্ট।