দেশের ব্যাংকিং খাতে স্থায়ী আমানত বা ফিক্সড ডিপোজিটের প্রবৃদ্ধি সাম্প্রতিক সময়ে কমে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বেশি মুনাফার বিকল্প বিনিয়োগে ঝোঁক, নির্বাচনসংক্রান্ত ব্যয় মেটাতে এফডিআর ভাঙানো এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নগদ অর্থ হাতে রাখার প্রবণতা বাড়ায় এ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিক (অক্টোবর–ডিসেম্বর) সময়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মোট আমানত ৩ দশমিক ৪২ শতাংশ বেড়েছে। তবে মোট আমানতের প্রায় অর্ধেক জুড়ে থাকা ফিক্সড ডিপোজিটের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ২৯ শতাংশে। আগের প্রান্তিকে (জুলাই–সেপ্টেম্বর ২০২৫) এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
তথ্য অনুযায়ী, পর্যালোচ্য প্রান্তিকে তফসিলি ব্যাংকগুলোর মোট আমানত দায় (আন্তঃব্যাংক আমানত ছাড়া) ৬৯৪ বিলিয়ন টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ ট্রিলিয়ন টাকায়। এর আগে জুলাই–সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে আমানত বেড়েছিল ৩৪৫ বিলিয়ন টাকা বা ১ দশমিক ৭৩ শতাংশ। আর আগের বছরের একই সময়ে (অক্টোবর–ডিসেম্বর ২০২৪) আমানত বেড়েছিল ৫৮৩ বিলিয়ন টাকা বা ৩ দশমিক ২০ শতাংশ।
অর্থবাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে আমানতের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। অনেক আমানতকারী বেশি মুনাফার আশায় মাসিক আয় স্কিম (এমআইএস), ডিপোজিট পেনশন স্কিম (ডিপিএস), মিলেনিয়াম স্কিম এবং ডাবল বেনিফিট স্কিমে ঝুঁকছেন। ফলে ফিক্সড ডিপোজিটের প্রবৃদ্ধি কমলেও অন্যান্য আমানতের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিকে ফিক্সড ডিপোজিট বেড়ে ২২৭ বিলিয়ন টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ১০ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন টাকায় দাঁড়িয়েছে। আগের প্রান্তিকে এই বৃদ্ধি ছিল ৫১৬ বিলিয়ন টাকা। একই সময়ে মোট আমানতের মধ্যে সঞ্চয়ী আমানতের অংশও কিছুটা কমেছে। ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর এই হার ছিল ২০ দশমিক ৬৬ শতাংশ, যা ৩১ ডিসেম্বর নেমে এসেছে ২০ দশমিক ৪৯ শতাংশে।
অন্যদিকে মোট আমানতের মধ্যে শহরাঞ্চলের আমানতের অংশ প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর–ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে এ হার ছিল ৮৪ দশমিক ০৭ শতাংশ, যা আগের প্রান্তিকের সমান এবং আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৮৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
এ বিষয়ে এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তৌাহিদুল আলম খান বলেন, নির্বাচনী চক্র ওই সময় বাজারের তারল্যের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। অনেকেই নির্বাচনসংক্রান্ত ব্যয় মেটাতে কিংবা সরকার পরিবর্তনের সময় নগদ অর্থ হাতে রাখতে সঞ্চয় তুলে নিয়েছেন বা ফিক্সড ডিপোজিট নবায়ন করেননি।
তিনি বলেন, “ফলে অনেক সঞ্চয় ভেঙে নগদ অর্থে রূপান্তর করা হয়েছে। নির্বাচন-পরবর্তী অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক আমানতকারী ব্যাংকে অর্থ রাখার বদলে নগদ অর্থ হাতে রাখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছেন।”
একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বেশি মুনাফার আশায় অনেক ফিক্সড ডিপোজিটকারী এমআইএস, ডিপিএস, মিলেনিয়াম ও ডাবল বেনিফিট স্কিমে চলে গেছেন। ব্যাংকগুলো এসব স্কিমকে ‘অন্যান্য আমানত’ হিসেবে গণনা করে।
তিনি জানান, এর ফলেই ফিক্সড ডিপোজিটের প্রবৃদ্ধি কমেছে। অন্যদিকে আগের প্রান্তিকে (জুলাই–সেপ্টেম্বর ২০২৫) যেখানে অন্যান্য আমানতের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ১০ দশমিক ৭৬ শতাংশ ছিল, তা ডিসেম্বর প্রান্তিকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫১ শতাংশে।













