ঢাকা || ১৩ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় বাড়ছে খরচ, চাপে টেক্সটাইল ও পোশাকশিল্প

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় বাড়ছে খরচ, চাপে টেক্সটাইল ও পোশাকশিল্প

ব্যাংক ইনফো

প্রকাশিত: ২১:০০, ১৩ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাতে। গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে বিঘ্ন, জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি এবং জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে আর্থিক চাপ বাড়ছে শিল্প উদ্যোক্তা, রপ্তানিকারক ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ওপর।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে জাহাজ ভাড়া বেড়েছে এবং পণ্য পরিবহনে সময়ও বাড়ছে। একই সঙ্গে পেট্রোলিয়ামভিত্তিক কাঁচামালের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পেট্রোলিয়াম ও এর উপজাত পণ্যের দামের ওঠানামা কৃত্রিম তন্তু বা ম্যান-মেইড ফাইবার (এমএমএফ) এবং অন্যান্য সিনথেটিক টেক্সটাইল উপকরণের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ফলে ব্লেন্ডেড ফেব্রিক ও এমএমএফভিত্তিক পোশাক তৈরির খরচও বাড়ছে।

এদিকে সংঘাতপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলতে অনেক জাহাজ বিকল্প রুট ব্যবহার করায় কনটেইনার সংকট ও ভাড়া বৃদ্ধির আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাড়তি পরিবহন ব্যয়, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি মিলিয়ে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

উদ্যোক্তাদের তথ্যমতে, স্থানীয় বাজারে পলিয়েস্টার পিএসএফের দাম প্রতি কেজিতে প্রায় ৯০ সেন্ট থেকে বেড়ে প্রায় ১.২২ ডলারে পৌঁছেছে, যা পেট্রোলিয়ামভিত্তিক কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিফলন।

এ ছাড়া স্প্যানডেক্স, লাইক্রা ও ইলাস্টিক সুতা মতো সিনথেটিক উপকরণের দামও ওঠানামা করছে, যা উৎপাদন ব্যয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। স্থানীয় টেক্সটাইল উৎপাদকদের মতে, দেশীয় বাজারেও চাহিদা-সরবরাহের পরিবর্তনের কারণে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের দাম বাড়ছে।

শফিকুর রহমান বলেন, ব্লেন্ডেড ফেব্রিক বা এমএমএফভিত্তিক পোশাকের প্রায় অর্ধেক কাঁচামালই পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য থেকে আসে।
তিনি জানান, সিনথেটিক ফিলামেন্টের দাম ইতোমধ্যে প্রায় ৩২ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে কাপড় তৈরির খরচ প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা প্রতি পোশাকে প্রায় ১৯ থেকে ২০ সেন্ট পর্যন্ত বাড়তি ব্যয় যোগ করবে।

তার মতে, শেষ পর্যন্ত পোশাকের দাম প্রতি পিসে ১০ থেকে ১৫ সেন্ট পর্যন্ত বাড়তে পারে। এ কারণে ক্রেতাদের সঙ্গে নতুন করে দাম নিয়ে আলোচনা করতে হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে এলএনজি ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানির খরচও বাড়তে পারে, যা স্থানীয় শিল্পের উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

এদিকে বিটিএমএ এর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার ফলে পেট্রোলিয়ামজাত কাঁচামালের দামও বাড়ছে।
তিনি জানান, প্রাথমিক টেক্সটাইল উৎপাদক হিসেবে বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত পোশাক প্রস্তুতকারকদের ওপর চাপানো হবে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরও প্রভাব ফেলবে।

তার মতে, যদি তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে এমএমএফ বা ব্লেন্ডেড সুতা দিয়ে তৈরি পোশাকের চাহিদা কমে যেতে পারে এবং ক্রেতারা তুলাভিত্তিক পোশাকের দিকে ঝুঁকতে পারেন। তবে পরিবহন ব্যয় বাড়লে তুলার দামও বাড়তে পারে।

অন্যদিকে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে বিঘ্ন ঘটলে বৈশ্বিক তেলের দাম আরও বাড়তে পারে এবং গ্যাস সরবরাহেও সংকট দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে এলপিজি ও এলএনজির সরবরাহ এতে প্রভাবিত হতে পারে।

তিনি বলেন, উৎপাদন ব্যয় বাড়লে সাধারণত বাজারে চাহিদা কমে যায়। এছাড়া হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হলে অনেক জাহাজকে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ হয়ে দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হতে পারে। এতে পরিবহন সময় ও খরচ উভয়ই বাড়বে।

খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক শিল্পের ওপরও।