মোবাইলে আর্থিক সেবা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান নগদের গ্রাহক ও লেনদেন বাড়ার পাশাপাশি প্রথমবারের মতো নিট মুনাফা করতে শুরু করেছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি সরকারকে দেওয়া করও দুই বছরের ব্যবধানে দ্বিগুণের বেশি করেছে। ডাক বিভাগের লাইসেন্সে পরিচালিত হওয়ায় নগদের আয় থেকে নিয়মিত মুনাফার অংশও পাচ্ছে সরকার।
নগদের আর্থিক তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ করা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে আসার পর প্রতিষ্ঠানটির সক্রিয় গ্রাহক ও লেনদেন দুটোই বেড়েছে। আন্তব্যাংক ও এমএফএস লেনদেনেও যুক্ত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সব মিলিয়ে গত দুই বছরে নগদের ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭১ শতাংশ, যেখানে পুরো এমএফএস খাতের প্রবৃদ্ধি ৫১ শতাংশ।
বাড়ছে গ্রাহক ও লেনদেন
২০২৪ সালের আগস্টে নগদের সক্রিয় গ্রাহক ছিল ১ কোটি ২০ লাখ। চলতি বছরের জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৭৪ লাখে। অর্থাৎ প্রায় দুই বছরে সক্রিয় গ্রাহক বেড়েছে ৫৪ লাখ। অবশ্য গত মে মাসে গ্রাহকসংখ্যা সাময়িকভাবে ২ কোটি ১৫ লাখে উঠেছিল।
গ্রাহক বৃদ্ধির সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে লেনদেনও। ২০২৪ সালের আগস্টে নগদে লেনদেন হয়েছিল ২৩ হাজার ৩২ কোটি টাকা। তখন দৈনিক গড় লেনদেন ছিল এক হাজার কোটি টাকার নিচে। চলতি বছরের জুলাইয়ে মাসিক লেনদেন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ২৮১ কোটি টাকা। এতে দৈনিক গড় লেনদেন এক হাজার ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
এ সময়ে দেশের এমএফএস বাজারেও নগদের হিস্যা বেড়ে হয়েছে ১৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
প্রথমবার নিট মুনাফা
প্রতিষ্ঠার পর চলতি বছর প্রথমবারের মতো নিট বা প্রকৃত মুনাফা করতে শুরু করেছে নগদ। চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা ছিল ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এপ্রিলে তা বেড়ে সাড়ে ৪ কোটি টাকায় ওঠে। জুনে নিট মুনাফা হয়েছে ২ কোটি ২০ লাখ টাকা।
নগদের আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, ব্যবসার পরিধি বাড়ার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ভিত্তিও শক্তিশালী হয়েছে। তবে মালিকানা নিয়ে জটিলতার এখনো পুরোপুরি সুরাহা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন বিনিয়োগ আনার উদ্যোগ নিলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। দেশি-বিদেশি একাধিক প্রতিষ্ঠান অবশ্য নগদে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে সরকারের কর
নগদের ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে সরকারের রাজস্বও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি সরকারকে কর দিয়েছিল ১৪৬ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ২৮২ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নগদ সরকারকে কর দিয়েছে ৩১৩ কোটি টাকা।
অর্থাৎ দুই অর্থবছরের ব্যবধানে সরকারের পাওয়া কর বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। নগদের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব পাওয়ার অধিকারী, তার পুরোটাই পরিশোধ করা হচ্ছে। এ কারণে লেনদেন বৃদ্ধির তুলনায় করের পরিমাণ বেশি বেড়েছে।
মুনাফার ভাগ পাচ্ছে ডাক বিভাগ
ডাক বিভাগের লাইসেন্সের অধীনে এমএফএস সেবা পরিচালনা করছে নগদ। বাংলাদেশ ব্যাংক ডাক বিভাগকে এই লাইসেন্স দিয়েছে। পরে ডাক বিভাগের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে সেবা পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
চুক্তি অনুযায়ী, নগদের সেবা থেকে অর্জিত আয়ের ৫১ শতাংশ পাবে ডাক বিভাগ এবং ৪৯ শতাংশ পাবে নগদ। ফলে ব্যবসা বাড়ার সঙ্গে ডাক বিভাগের আয়ও বাড়ছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে মুনাফার অংশ হিসেবে ডাক বিভাগকে ৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা দিয়েছিল নগদ। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দিয়েছে ১৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডাক বিভাগ পেয়েছে ১৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা।
প্রশাসকের অধীনে পরিচালনা
২০১৯ সালের ২৬ মার্চ যাত্রা শুরু করা নগদের পরিচালনার সঙ্গে শুরুতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তাঁদের অনেকে দেশ ছেড়ে চলে যান। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার নগদে প্রশাসক নিয়োগ করে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ করা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. মোতাছিম বিল্লাহ। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নগদের পরিচালনায় বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে একাধিক পরিচালক ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলাও করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
মো. মোতাছিম বিল্লাহ বলেন, “অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও আমরা নগদকে নিয়মের মধ্যে এনে আরও গ্রাহকবান্ধব করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। এতে প্রতিনিয়ত সক্রিয় গ্রাহক ও লেনদেন বাড়ছে। নগদের ওপর মানুষের আস্থাও গত কয়েক বছরে আরও বেড়েছে।”














