ব্যাংক খাতে পরিবারের নিয়ন্ত্রণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক যে কঠোর সংশোধনী প্রস্তাব করেছিল, তার বেশ কয়েকটি শিথিল করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। একই পরিবারের সর্বোচ্চ তিনজন পরিচালক রাখার বিদ্যমান বিধান বহাল থাকছে। তবে একজন পরিচালকের একটানা সর্বোচ্চ মেয়াদ ১২ বছর থেকে কমিয়ে ৯ বছর করার বিষয়ে সম্মতি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের খসড়ায় একই পরিবারের পরিচালকসংখ্যা তিনজন থেকে কমিয়ে দুইজন এবং পরিচালকের একটানা মেয়াদ ছয় বছর করার প্রস্তাব ছিল। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) দুটি প্রস্তাবই নাকচ করে দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে বিদ্যমান পারিবারিক প্রতিনিধিত্বের বিধান বহাল রেখে সংশোধিত খসড়া দ্রুত জমা দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত ২০ সেপ্টেম্বর এফআইডির সচিব নাজমা মোবারেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পর্যালোচনা সভায় এসব সিদ্ধান্ত হয়। সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএবি, আইন ও বিচার বিভাগ, এনবিআর, বিএসইসি, সোনালী ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএসহ ১৭টি প্রতিষ্ঠান সভায় অংশ নেয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ, ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতার কথা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কঠোর প্রস্তাব শিথিল করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বর্তমান ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৫(১০) ধারায় একই পরিবারের সর্বোচ্চ তিনজন সদস্য একই সময়ে একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থাকতে পারেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এই সংখ্যা কমিয়ে দুইজন করার প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে ব্যাংকমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)সহ অংশীজনেরা এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন।
পরিচালকের মেয়াদের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব ছিল। ২০১৮ সালে পরিচালকের একটানা মেয়াদ ছয় বছর থেকে বাড়িয়ে ১২ বছর করা হয়। ২০২৩ সালের সংশোধনীতেও ১২ বছরের বিধান বহাল থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংক এবার তা ছয় বছরে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেছিল। বিএবি যুক্তি দেয়, এত দ্রুত মেয়াদ শেষ হলে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ অভিজ্ঞ পরিচালক হারাতে পারে। শেষ পর্যন্ত মেয়াদ নয় বছরে নামানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ব্যাংক খাতে সুশাসন জোরদারের জন্য প্রস্তাবিত আরও একটি কঠোর বিধানও বাদ যাচ্ছে। বর্তমান আইনে কোনো পরিচালক নিজের নামে নেওয়া বা তাঁর গ্যারান্টি দেওয়া ঋণখেলাপি হলে দুই মাসের মধ্যে তা নিয়মিত করতে হয়। ব্যর্থ হলে তিনি পরিচালকের পদ হারান এবং ঋণ পরিশোধে তাঁর শেয়ার বিক্রি করা যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রস্তাব করেছিল, কোনো পরিচালকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোম্পানি ঋণখেলাপি হলেও ওই পরিচালককে পদ হারাতে হবে। এ প্রস্তাবটি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ঋণ পরিশোধের পর পরিচালনা পর্ষদে ফিরতে অপেক্ষার সময় এক বছর থেকে কমিয়ে ছয় মাস করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তবে ঋণ নিয়মিত করার জন্য নোটিশ পাওয়ার পর অন্তত ছয় মাস সময় এবং ঋণ পরিশোধে শেয়ার বিক্রির জন্য আরও সময় দেওয়ার দাবি করেছেন ব্যাংকমালিকেরা। এসব বিষয়ে আরও পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, প্রস্তাবিত সংশোধনীর লক্ষ্য ছিল ব্যাংকের ওপর ব্যক্তি ও পরিবারের আধিপত্য কমানো। তিনি বলেন, সংশোধনী বাস্তবায়ন না হলে ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা কঠিন হবে এবং ব্যাংকগুলো ‘পারিবারিক ব্যাংকে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
এদিকে পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য বড় অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহে কৌশলগত বিনিয়োগের বিদ্যমান সীমা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত কৌশলগত বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে এ সীমা থাকবে না, তবে সরকারের অনুমোদন লাগবে।
সরকার ইতিমধ্যে কাতারকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কৌশলগত অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যান্য মুসলিম-প্রধান দেশ ও আন্তর্জাতিক ইসলামী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেও বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। ভবিষ্যতে অন্য ব্যাংকেরও বড় অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করার বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতাতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বর্তমান আইনের ৪৭ ধারায় আমানতকারী বা ব্যাংকের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর কার্যক্রমের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্ষদ বিলুপ্ত করে প্রশাসক নিয়োগ করতে পারে।
২০২৪ সালের আগস্টের পর কয়েকটি ব্যাংকের পর্ষদ বিলুপ্ত করার অভিজ্ঞতায় শেয়ারহোল্ডারদের নির্বাচিত পরিচালকদের সরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেয়। সংশোধনীতে এ বিষয়টি স্পষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পর্ষদ বিলুপ্ত না করেও প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ রাখার নতুন বিধান বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া পরিবারের সংজ্ঞা বিস্তৃত করে একই পরিবারের সদস্যরা ভিন্ন ধরনের আত্মীয়তার পরিচয়ে পরিচালনা পর্ষদে থাকার সুযোগ বন্ধ এবং স্বতন্ত্র পরিচালকের অংশ সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব বহাল রয়েছে।
এফআইডির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, সংশোধিত খসড়া দ্রুত চূড়ান্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংককে পুনরায় জমা দিতে বলা হয়েছে। এরপর আইন মন্ত্রণালয়ের যাচাই, মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন এবং সংসদীয় প্রক্রিয়া শেষে আগামী সংসদ অধিবেশনে আইনটি পাসের জন্য উত্থাপন করা হতে পারে।













