দেশের অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের প্রকৃত অবদান কত, তা পরিমাপ করতে দেশজুড়ে জরিপ শুরু করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সহযোগিতায় পরিচালিত এ জরিপের মাধ্যমে পর্যটকদের ব্যয়, ভ্রমণের ধরন, পর্যটনসংশ্লিষ্ট পণ্য ও সেবার ব্যবহার এবং কর্মসংস্থানের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এর ভিত্তিতে পর্যটনের অর্থনৈতিক অবদান নির্ধারণে তৈরি করা হবে ‘ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট’ (টিএসএ)।
২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য এ কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। পুরো অর্থবছরজুড়ে প্রতি তিন মাস অন্তর তথ্য সংগ্রহ করা হবে। জুলাই–সেপ্টেম্বর, অক্টোবর–ডিসেম্বর, জানুয়ারি–মার্চ এবং এপ্রিল–জুন—এই চার সময়ে জরিপ পরিচালিত হবে।
টিএসএ হলো জাতীয় হিসাবের সঙ্গে সংযুক্ত একটি পরিপূরক পরিসংখ্যান কাঠামো, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট একটি খাতের অর্থনৈতিক কার্যক্রম আলাদাভাবে পরিমাপ করা যায়। পর্যটন খাতের ক্ষেত্রে এর মাধ্যমে পর্যটনের সরাসরি মোট মূল্য সংযোজন বা ট্যুরিজম ডাইরেক্ট গ্রস ভ্যালু অ্যাডেড (টিডিজিভিএ) নির্ধারণ করা হবে। পাশাপাশি মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) পর্যটনের অবদানও হিসাব করা হবে।
জরিপের আওতায় দেশের ভেতরে ভ্রমণকারী বাংলাদেশি, বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশি এবং বাংলাদেশে আসা বিদেশি নাগরিক ও অনাবাসী বাংলাদেশিদের তথ্য নেওয়া হবে। বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও সমুদ্রবন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ ও দেশত্যাগের সময় এসব তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
অবকাশযাপন ছাড়াও ব্যবসা, চিকিৎসা, শিক্ষা, ধর্মীয় কার্যক্রম এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া ব্যক্তিদের ভ্রমণও জরিপের আওতায় থাকবে। তবে যেসব ট্রানজিট যাত্রী ও পরিবহনকর্মী ইমিগ্রেশন পার হন না, তাঁদের এ জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না।
বিবিএসের কর্মকর্তারা বলছেন, পর্যটন খাত নিয়ে এত দিন বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন ধরনের তথ্য পাওয়া গেলেও একটি সমন্বিত পরিসংখ্যানভিত্তি তৈরি করা সম্ভব হয়নি। নতুন জরিপের মাধ্যমে আবাসন, পরিবহন, বিনোদনসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতের কার্যক্রমের তথ্য এক জায়গায় আনা যাবে। এতে পর্যটনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি আরও স্পষ্ট হবে।
জরিপের তথ্য থেকে পর্যটন খাতে কর্মসংস্থান, ভ্রমণ ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রমের চিত্রও পাওয়া যাবে। ফলে পর্যটন খাতে কোথায় চাহিদা বাড়ছে, কোন ধরনের অবকাঠামো বা বিনিয়োগ প্রয়োজন এবং কোন এলাকায় সম্ভাবনা বেশি—এসব বিষয়ে সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি খাত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য পাবে।
বিবিএস জানিয়েছে, জরিপের ভিত্তিতে তৈরি তথ্যভান্ডার পর্যটন খাতের পরিকল্পনা, নীতি প্রণয়ন ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি পর্যটনসংশ্লিষ্ট টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির সূচক পরিমাপেও এসব তথ্য কাজে লাগবে।
এর পাশাপাশি একটি সমন্বিত জাতীয় পর্যটন তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সরকারি সংস্থা, নীতিনির্ধারক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও উন্নয়ন সহযোগীরা প্রয়োজনীয় তথ্য ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।
বিবিএসের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহের ফলে এটি শুধু এককালীন জরিপে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সময়ের সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রবণতার পরিবর্তন এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাবও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
খসড়া জাতীয় পর্যটন পরিকল্পনায় সারা দেশে ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজার, সুন্দরবন, শ্রীমঙ্গল, জাফলং, সাজেক ভ্যালি, রাঙামাটি, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার এবং বাগেরহাটের মসজিদ নগরী দেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে বিবেচিত।
পর্যটন খাতের আকার ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। নতুন এ জরিপ থেকে পাওয়া তথ্য সেই ঘাটতি পূরণে সহায়ক হবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।














