দেশের ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে। রেমিট্যান্স ও আমানত বাড়ায় ব্যাংকগুলোর হাতে ঋণ দেওয়ার মতো অর্থ বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ উল্টো দুর্বল হয়ে পড়েছে। ঋণখেলাপির ঝুঁকি ও সরকারের ঋণ নেওয়া বাড়ায় ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দেওয়ার বদলে তুলনামূলক কম ঝুঁকির সরকারি সিকিউরিটিজে অর্থ বিনিয়োগ করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়ে ৪ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকায় উঠেছে। জুলাইয়ে এর পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি এবং জুনে ৪ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এ তারল্য বৃদ্ধির গতি আরও বেড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের জুনে বেড়ে ২ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
ব্যাংক খাতের এই অতিরিক্ত অর্থের বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ছে না। আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ, যা টানা ষষ্ঠ মাসের মতো ৫ শতাংশের নিচে। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের দীর্ঘদিনের পরিসংখ্যানের অন্যতম নিম্ন পর্যায়।
ব্যাংকাররা বলছেন, সাধারণত আমানত বাড়লে তার একটি অংশ ঋণ হিসেবে ব্যবসা ও বিনিয়োগে যাওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্ক। অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও নতুন ঋণ নেওয়ার আগ্রহ কমেছে। ফলে ঋণের সরবরাহ ও চাহিদা—দুই দিক থেকেই চাপ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদের মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং সরকারের ঋণ নেওয়া বাড়ায় ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে আরও সতর্ক হয়ে উঠেছে। এর ফলে উদ্বৃত্ত অর্থের একটি বড় অংশ বেসরকারি খাতের পরিবর্তে সরকারি সিকিউরিটিজে চলে যাচ্ছে।
খেলাপি ঋণের বড় বোঝাও ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা ও আগ্রহে প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৬ শেষে শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৬ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এর পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা। মোট বকেয়া ঋণের ৩২ শতাংশের বেশি এখন শ্রেণিকৃত ঋণ।
বড় ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও খারাপ। ৫০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণের ক্ষেত্রে শ্রেণিকৃত ঋণের হার জুনে ৪৩ দশমিক ৪ শতাংশে উঠেছে। বিপরীতে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ১৫ শতাংশ।
ব্যাংক খাতের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রায় ২০টি ব্যাংক কার্যত নতুন ঋণ বিতরণ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। অন্য অনেক ব্যাংকও ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই আরও কঠোর করেছে। এমনকি আর্থিকভাবে সক্ষম ও ভালো গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও ঋণ অনুমোদনে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে ব্যাংক খাতে আমানত দ্রুত বাড়ছে। জুলাই ২০২৬ শেষে ব্যাংকগুলোর মোট আমানত বেড়ে ২০ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা এক বছর আগে ছিল ১৮ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা।
এর পেছনে রেমিট্যান্সের বড় ভূমিকা রয়েছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, আগের অর্থবছরে যা ছিল ৩ হাজার ৩২ কোটি ডলার। চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জুলাই–সেপ্টেম্বর সময়ে প্রবাসীরা আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে আরও ৮৬০ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন। আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৭৫৮ কোটি ডলার।
রেমিট্যান্স বাড়লে সাধারণত পরিবারের আয় ও ব্যাংক আমানত বাড়ে। ফলে ব্যাংকগুলোর হাতে ঋণ দেওয়ার মতো অর্থও বাড়ে। কিন্তু বর্তমানে সেই অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ উৎপাদনশীল খাতে না গিয়ে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ হচ্ছে।
সরকারের ব্যাংকঋণ বৃদ্ধিও এ প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে। চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই–আগস্টে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সরকারকে মোট ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা। ওই সময়ে ৩ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা পরিশোধের পর সরকারের ব্যাংকব্যবস্থা থেকে নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা।
এর আগে ২০২৫–২৬ অর্থবছরেই সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল।
ব্যাংকারদের কাছে সরকারি সিকিউরিটিজ তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হওয়ায় খেলাপি ঋণের ঝুঁকির মধ্যে অনেক ব্যাংক এ খাতে অর্থ রাখতে আগ্রহী হচ্ছে। ফলে ব্যাংকে অর্থ ঢোকার পরিমাণ বাড়লেও ব্যবসা ও বিনিয়োগে সেই অর্থের প্রবাহ বাড়ছে না।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, দীর্ঘ সময় এ পরিস্থিতি চললে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রভাব পড়তে পারে। কারণ অর্থনীতিতে তারল্য থাকলেও তা যদি ব্যবসা সম্প্রসারণ, শিল্প স্থাপন ও নতুন বিনিয়োগে না যায়, তাহলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার প্রত্যাশিত প্রভাব তৈরি হয় না।
ফলে বর্তমানে ব্যাংক খাতে এক ধরনের বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে—রেমিট্যান্স বাড়ছে, আমানত বাড়ছে এবং তারল্য রেকর্ড উচ্চতায় উঠছে; অথচ বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ রয়েছে ঐতিহাসিক নিম্নস্তরের কাছাকাছি।













