হাইকোর্টে বিচারাধীন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ৪৬৮ কোটি টাকার আয়কর বিরোধ বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) প্রক্রিয়ায় মীমাংসার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ)। দীর্ঘদিন ধরে চলা এসব কর মামলা আদালতের বাইরে দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব আদায় করতে চায় কর কর্তৃপক্ষ।
এ লক্ষ্যে গত ২৭ সেপ্টেম্বর ইসলামী ব্যাংককে নোটিশ দিয়েছে এলটিইউ। এতে ১২ অক্টোবরের মধ্যে প্রতিটি কর বিরোধের বিষয়ে ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে। এলটিইউ ঢাকার কর কমিশনার মো. মোস্তাফিজুর রহমান ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে এ চিঠি পাঠান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্যাংকটির সঙ্গে কর বিরোধগুলো ১৪টি আয়বর্ষের। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ১৮২ কোটি টাকার বিরোধ ২০২০-২১ করবর্ষের। ২০১৯-২০ করবর্ষে বিরোধ রয়েছে ১২২ কোটি টাকা। এই দুই করবর্ষের বিরোধের পরিমাণ ৩০৪ কোটি টাকা, যা মোট দাবির প্রায় ৬৫ শতাংশ।
এ ছাড়া ২০০৯-১০ করবর্ষে ৫১ কোটি ৮২ লাখ, ২০১৮-১৯ করবর্ষে ৩৫ কোটি ৩০ লাখ এবং ২০২১-২২ করবর্ষে ২৩ কোটি ৩০ লাখ টাকার বিরোধ রয়েছে। বাকি বিরোধগুলো ২০০২ থেকে ২০০৯ এবং ১৯৯৭ সালের আয়বর্ষের। সবচেয়ে পুরোনো বিরোধটি ১৯৯৭ আয়বর্ষের, যার মূল্যায়ন বছর ১৯৯৮-৯৯।
গত ৬ জুলাই এনবিআরের নির্দেশনা এবং ১৩ আগস্ট অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে হাইকোর্টে বিচারাধীন কর মামলাগুলো এডিআরের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই ইসলামী ব্যাংকের দীর্ঘদিনের কর বিরোধগুলো নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এডিআর ব্যবস্থায় করদাতা ও কর কর্তৃপক্ষ আদালতের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার বাইরে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসার সুযোগ পান। এতে মামলা নিষ্পত্তিতে সময় ও ব্যয় কমানোর পাশাপাশি দীর্ঘদিন আটকে থাকা রাজস্ব আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়।
তবে ব্যাংকটির বর্তমান আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কর্মকর্তারা। ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম কামালউদ্দিন জসিম বলেন, একসময় ইসলামী ব্যাংক দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বৃহৎ করদাতা ছিল এবং ব্যাংকটি তার প্রাপ্য কর পরিশোধে সব সময়ই আগ্রহী ছিল। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা কর পরিশোধের মতো অবস্থায় নেই।
২০১৭ সালের পর ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার অবনতি শুরু হয় বলে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এ সময়ে মুনাফা কমার পাশাপাশি আমানতকারীদের মুনাফা পরিশোধের চাপও ছিল।
২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয়। বিভিন্ন নথি অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে গ্রুপটির নিজস্ব ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৮০ শতাংশ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংকটির পক্ষ থেকে বর্তমানে এ নিয়ন্ত্রণ নেই।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ইসলামী ব্যাংক এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।
চলতি বছরের জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ ছিল ইসলামী ব্যাংকের। ওই সময় পুরো ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির বিতরণ করা মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ।
সাবেক এডিআর ফ্যাসিলিটেটর ও এনবিআরের আয়কর নীতি শাখার সাবেক সদস্য সৈয়দ আমিনুল করিম বলেন, এডিআরে কর কর্মকর্তা ও করদাতা—দুই পক্ষেরই সমঝোতার মানসিকতা থাকা প্রয়োজন। শুধু সময়ক্ষেপণের উদ্দেশ্যে এ ধরনের নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন, এডিআরের মাধ্যমে কোনো সমঝোতা অনুমোদনকারী কর্মকর্তারা যাতে সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির জন্য ব্যক্তিগতভাবে দায়ী না হন, সে জন্য সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের এই কর বিরোধ এডিআরে নিষ্পত্তি হলে দীর্ঘদিনের বিচারাধীন মামলা কমার পাশাপাশি সরকারের আটকে থাকা রাজস্ব আদায়ের পথও খুলতে পারে। তবে ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক সক্ষমতা এবং কর কর্তৃপক্ষের দাবির যৌক্তিকতা—দুই বিষয়ই নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।













